রাজা হরিশচন্দ্র: যার রাজধানী সম্ভার থেকে সাভার নামের উৎপত্তি

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
101

বর্তমান সময়ে স্থান হিসেবে মজিদপুরের প্রসিদ্ধি না থাকলেও প্রাচীনকালে এ অঞ্চলটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহাসিক কিছু সংশয় ছাড়া বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞের ধারণা অনুযায়ী, ঢাকার গুলিস্তান জিরো পয়েন্ট থেকে প্রায় ২৪ কি.মি. উত্তর-পশ্চিমে প্রাচীন বংশাবতী বা অধুনা বংশী নদীর বাঁ তীরে অবস্থিত ছিল পাল বংশীয় রাজা হরিশচন্দ্রের শাসনাধীন সর্বেশ্বর রাজ্যের রাজধানী। এ রাজধানীর নাম ছিল সম্ভার। এই সম্ভার নাম থেকেই পরবর্তীকালে সাভার নামের উৎপত্তি হয়েছে। খ্রিষ্টীয় সপ্তম-অষ্টম শতকে তৎকালীন সম্ভার রাজ্যের রাজা হরিশ্চন্দ্রের প্রাসাদ-ভিটা সাভারের মজিদপুরে অবস্থিত ছিল।

বর্গাকার ঢিবির চার পাশে এরকম চার সারি সিঁড়ি আছে। সোর্স: রিসাত

বাস থেকে সাভারে নেমে ওভারব্রিজ পেরিয়ে এলাম। সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডের পূর্ব দিকে। মজিদপুর গ্রামে প্রাসাদটির অবস্থান। কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করতেই রাজা হরিশচন্দ্রের প্রাসাদে যাওয়ার রাস্তা দেখিয়ে দিল। ওভারব্রিজ থেকে নেমে একটু সামনে এগিয়ে গেলেই একটা গলিমতো রাস্তা আছে। রাস্তার মুখেই সাইনবোর্ডে লেখা রাজা হরিশচন্দ্রের প্রাসাদ। নাস্তা খেয়ে রিকশায় চেপে গেলাম প্রাসাদে। প্রাসাদ শুনে রিকশাওয়ালা হাসে। বলে, “প্রাসাদ-টাসাদ কিচ্ছু নাই ওখানে”। আমরাও পাল্টা হাসি দিলাম। বললাম, “যা আছে, সেটা দেখতেই যাচ্ছি।”

জায়গাটি রাজা হরিশচন্দ্রের ঢিবি, রাজা হরিশচন্দ্রের বাড়ি, রাজা হরিশচন্দ্রের ভিটা ইত্যাদি নামেও পরিচিত।
অনেকে বলেন কোটবাড়ি ঢিবি, অনেকে বলেন রাজা হরিশচন্দ্রের প্রাসাদ। স্থানীয় লোকজনের কাছে এই প্রাচীন প্রত্নকেন্দ্রটি হরিশচন্দ্র রাজার বাড়ি হিসেবে পরিচিত। নদীর তীরে গড়ে ওঠা প্রাচীন বসতির একটি অন্যতম নিদর্শন এই রাজা হরিশচন্দ্রের ঢিবি বা প্রাসাদ।

মূল প্রবেশপথ। সোর্স: রিসাত

ব্যাপকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত মাটির দেয়ালঘেরা বৃহৎ ঢিবিটি আয়তাকার। এখানে কমপক্ষে তিনটি এলাকায় বৌদ্ধ মঠের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। এর একটি রাজা হরিশচন্দ্রের ঢিবি বা প্রাসাদ। মনে করা হয়, প্রাসাদটি সপ্তম-অষ্টম শতকের নিদর্শন। নব্বইয়ের দশকে খননের পর দেয়ালবেষ্টিত বর্গাকার একটি স্তূপের সন্ধান মেলে। আরও পাওয়া যায় একটি ‘হরিকেল’ রৌপ্যমুদ্রা, একটি স্বর্ণমুদ্রা এবং ব্রোঞ্জের তৈরি বেশ কয়েকটি বুদ্ধমূর্তি।

হরিশচন্দ্রের রাজবাড়ি বা ঢিবি উনিশ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত মাটির নিচেই ছিল। ১৯১৮ সালের দিকে রাজবাড়ি-ঢিবির কাছের রাজাসন গ্রামে ড. নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ শুরু করেন। তারই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীকালে হরিশচন্দ্র রাজার প্রাসাদ-ঢিবিতে খননকাজ চালানো হয়।

কেবল সাইনবোর্ডেই প্রত্নতত্ত্বের অধীনে, বাস্তবে নয়। সোর্স: রিসাত

৭-৮ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম। চারপাশে বাউন্ডারি করা একটা সিঁড়িওয়ালা ঢিবি দাঁড়িয়ে আছে কেবল। অন্তত বাইরে থেকে দেখে ওরকমই মনে হলো। এগিয়ে দেখি, বহুল ব্যবহারে এবং কালের বিবর্তনে সিঁড়িগুলো ক্ষয়ে গিয়েছে। আলতো পায়ে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে দেখি, যতটা সাধারণ বলা হয়েছে, ততটা সাধারণও নয়। পুরো ঢিবিটা বর্গাকার। চারপাশে চার প্রস্থ সিঁড়ি। একপাশে এখনো হয়তো খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। সেই খোঁড়া জায়গাটার মাটি ভেদ করে দুয়েক সারি ইটের দেয়াল দেখা যাচ্ছে। ওগুলো দেখে মনে হলো, হয়তো হরিশচন্দ্রের প্রাসাদের অনেকটাই এখনো মাটির নিচে রয়ে গিয়েছে।

খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতকে এখানে বৌদ্ধধর্ম সভ্যতা-সংশ্লিষ্ট একটি কেন্দ্র ছিল বলে বোঝা যায়। ঢিবি এলাকায় একাধিক পুনর্নির্মাণ এবং একাধিক মেঝের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ১৯৮৯-৯০ সালে খননের পর দেয়ালবেষ্টিত বর্গাকার এই স্তূপের সন্ধান মেলে।

সিঁড়ির চারটি ধাপ। সোর্স: রিসাত

মজার ব্যাপার হলো, রাজা হরিশচন্দ্র কেবল রাজা নন, তান্ত্রিকও ছিলেন! সাভার নগরীতে তান্ত্রিক বৌদ্ধ শাসকদের মধ্যে রাজা হরিশচন্দ্রের নাম উল্লেখযোগ্য। ময়নামতির তান্ত্রিক মহারানীর পুত্র গোপীনাথের সঙ্গে রাজা হরিশ চন্দ্রের জ্যেষ্ঠ কন্যা অনুদার বিয়ে ও কনিষ্ঠ কন্যা পদুনাকে যৌতুক প্রদানের কাহিনী বিজড়িত এ হরিশচন্দ্রের প্রাসাদ ও ঢিবি।

তৎকালীন ভারতবর্ষে এ দেশে ঐতিহ্যের নিদর্শন খুঁজে বের করতে কিছু প্রত্নতত্ত্ববিদ অনুসন্ধান কাজ চালিয়েছেন। সে সময় অনেক জায়গায় ইতিহাসের নামকরা রাজা-মহারাজাদের প্রাসাদ নির্দিষ্ট করা হয়েছিল, যার মধ্যে রয়েছে বারো ভূঁইয়ার ঈশা খাঁর আজকের সোনারগাঁ। এরও অনেক পরে বের হয়ে আসে ঢাকার অদূরে সাভারে রাজা হরিশচন্দ্রের প্রাসাদ ও ঢিবি।

পিছন দিকে খননকাজ চলছে। সোর্স: রিসাত

প্রাসাদটিতে স্তূপসহ একটি বিহারের ধ্বংসাবশেষ অনাবৃত রয়েছে। বিহারটি ৪০ বর্গমিটার ও স্তূপটি ১৭ বর্গমিটার প্রশস্ত। এর ১৫০ মিটার পূর্বে রাজাশন নামে একটি ঢিবি রয়েছে, যা এখনও সম্পূর্ণরূপে খনন হয়নি। এ দুটি প্রত্নস্থল থেকে বেশ কয়েকটি ভাস্কর্যখচিত পোড়ামাটির টুকরো, ব্রোঞ্জের তৈরি বৌদ্ধ মূর্তি, বিভিন্ন টেরাকোটা ও গুপ্ত অবস্থায় লুকায়িত স্বর্ণমুদ্রাও আবিষ্কৃত হয়, যা পরে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মাধ্যমে জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হলো, কয়েক দশকে এ এলাকায় জমির মূল্য বেড়ে কয়েকগুণ হয়েছে। তাই রাজা হরিশচন্দ্রের প্রাসাদ ও তার ভূসম্পত্তির সিংহভাগই জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে দখল হয়ে যাচ্ছে। এমনকি কিছু অংশ বিক্রিও হয়ে গেছে। অনেকে প্লট আকারে এ সম্পত্তি বিক্রি করে নির্মাণ করছে ভবন। এছাড়া সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ও সরকারি হুকুম দখলকৃত রাজাশন ঢিবিতেও বেআইনিভাবে ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এভাবে দখল চলতে থাকলে এ ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন বিলুপ্ত হয়ে যাবে। যদিও দখলবাজ ও প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর।

কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা। সোর্স: রিসাত

বর্তমানে সংরক্ষিত পুরাকীর্তির স্থানটি মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসীদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে। আমরা গিয়ে দেখেছি, জায়গাটা সকলের জন্য উন্মুক্ত। জায়গায় জায়গায় সিগারেটের প্যাকেট পড়ে থাকতে দেখেছি। আশা করছি, জায়গাটি এদের হাত থেকে দখলমুক্ত হবে।

কীভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে সাভারগামী যেকোনো বাস, যেমন- ঠিকানা, লাব্বাইক, সাভার ইত্যাদি বাসে করে সাভার বাস স্ট্যান্ডে নামবেন। ওভারব্রিজ দিয়ে রাস্তা পেরিয়ে রিকশায় করে যেতে হবে রাজা হরিশচন্দ্রের প্রাসাদে।

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
101
Booking.com

One Comment

Leave a Reply
  1. আমার বাসার পাশেই হরিচন্দ্র রাজার আবাস প্রাসাদ প্রত্নস্থল। “”বর্তমানে সংরক্ষিত পুরাকীর্তির স্থানটি মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসীদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে। আমরা গিয়ে দেখেছি, জায়গাটা সকলের জন্য উন্মুক্ত। জায়গায় জায়গায় সিগারেটের প্যাকেট পড়ে থাকতে দেখেছি। আশা করছি, জায়গাটি এদের হাত থেকে দখলমুক্ত হবে।””
    কথাটির সাথে সম্পূর্ণ দ্বীমত পোষণ করলাম।
    *বর্তমানে এখানে কোন রকম নেশা-আড্ডাবাজি, মাদক ব্যাবসা নেই।
    *৭ টার পরে এর অভ্যন্তরে প্রবেশ নিষেধ।
    *কিছুদিন পর পর পুলিশ হতে টহল দেওয়া হয়।
    *বিড়ি ছিগারেট কোথায় খাওয়া হয় না বলতে পারেন???
    *বর্তমানে সেখানে কোন খনন কাজ হচ্ছে না। 🙂 🙂

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *