অবৈধ দখলে জর্জরিত এক সময়কার অভিজাত চতুষ্ক বাড়ি রূপলাল হাউজ

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry

বিশালাকার এক ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার নাম রূপলাল হাউজ। পুরান ঢাকার ১৫ নং ফরাশগঞ্জের এই ঐতিহ্যবাহী ভবনটি ১৮২৫ সালে আরমেনিয়ান জমিদার আরাতুন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৮৩৫ সালে রূপলাল দাস এবং তার ভাই রঘুনাথ দাস বাড়িটি কিনে নেয়। রূপলাল বাড়িটিকে পুনর্নির্মাণ করেছিলেন। এরপর থেকে বাড়িটির নাম হয় “রূপলাল হাউজ”। লোকে বাড়িটিকে এই নামেই চেনে।

রূপলাল হাউজের বাইরের রূপ। সোর্স: রিসাত

রূপলাল দাস ছিল একজন ব্যবসায়ী। তিনি ছিলেন তার পরিবারের একমাত্র শিক্ষিত ব্যক্তি। প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলেন এবং সেই সময় স্কলারশিপ পেয়েছিলেন ১০ টাকা। জানা যায়, তিনি একজন সঙ্গীত অনুরাগীও ছিলেন। সামাজিক কর্মকাণ্ডে তার যতটুকু অংশগ্রহণ ছিল তার চেয়ে বেশি তিনি খরচ করতেন সঙ্গীতের পিছনে। সেই সময়ে রূপলাল হাউসে নিয়মিত সংগীতের আসর বসতো। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান, ওস্তাদ ওয়ালী উল্লাহ খান এবং লক্ষী দেবীসহ আরও অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ রূপলাল হাউজে সংগীত আসরে নিয়মিত আসতেন।

১৮৮৮ সালে লর্ড ডাফরিন ঢাকায় আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। তাদের সম্মানে নাচ-গানের আসর কোথায় হবে তা নিয়ে প্রতিযোগিতা হয় আহসান মঞ্জিল এবং রূপলাল হাউজের মধ্যে। এতে অনেক বেশি ভোটে বিজয়ী হয় রূপলাল হাউজ। ভবনের পশ্চিামংশে দোতলায় আকর্ষণীয় একটি নাচঘর অবস্থিত। এর মেঝে ছিল কাঠের তৈরি। তাঁর সম্মানে এখানে একটি নাচবল নাচের আসর আয়োজন করা হয়েছিলো। সেই সময়ে ৪৫ হাজার টাকা ব্যয়ে রূপলাল হাউসের আধুনিকীকরণ করা হয়। জানা যায়, সেই সময় বিদেশীরা ঢাকায় আসলে রূপলাল হাউজে কক্ষ ভাড়া করে থাকতেন। সেই যুগেই কক্ষপ্রতি ভাড়া ছিল ২০০ টাকা।

দোতলা। সোর্স: রিসাত

এছাড়াও রয়েছে কয়েকটি প্রশস্ত দরবার কক্ষ । পুরো বাড়ি জুড়ে উত্তর-দক্ষিণ পার্শ্বে রয়েছে প্রশস্ত বারান্দা। বারান্দা দুটি ইট-নির্মিত ‘সেমি-কোরিনথীয়’ স্তম্ভ বা সমায়ত ইটের স্তম্ভের ওপর সংস্থাপিত।

১৮৯৭ সালে বড় ধরনের ভুমিকম্প হলে বাড়িটি অনেকখানি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। নদীর দিকে সম্মুখভাগে ভবনের চূড়াতে একটি বড় ঘড়ি ছিল, ভূমিকম্পে ভেঙ্গে পড়ার পর ওটা আর ঠিক করা হয়নি।

এরপর প্রায় পঞ্চাশ বছর বাড়িটির অনেক অংশ প্রায় অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে। রূপলাল হাউজের একপাশে সুন্দর বাগান ছিল যা ‘রঘুবাবুর বাগান’ এবং একপাশে একটি পুল ছিল যার নাম ছিল শ্যামবাজার পুল। কালের বিবর্তনে অযত্নে অবহেলায় এগুলো নষ্ট হয়ে যায়। এরপর বুড়িগঙ্গা নদীকে ঘিরে বাজার গড়ে ওঠে যার নামকরণ করা হয় শ্যামবাজার। বাড়ির ভেতরের অংশে ইউরোপিয়ান অফিসার এবং ব্যবসায়ীরা থাকার ব্যবস্থা করেন।

কী অপূর্ব কারুকাজ! সোর্স: রিসাত

কিন্তু ১৯৩০ সালের দিকে নদীর অংশটি ব্যবসা কেন্দ্র হয়ে ওঠে ফলে বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠলে তারাও জায়গাটি ত্যাগ করেন। রূপলাল হাউজের সর্বশেষ মালিক রূপলালের পৌত্র যোগেন্দ্র দাস এবং তারকনাথ দাস। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাজনের পর দাসরা সপরিবারে ভারতে পাড়ি জমান। শেষ হয় রূপলাল হাউজের এক পর্বের ইতিহাস।

তবে এখানেই শেষ নয়। ১৯৪৮ সালে বাড়িটি সরকারী সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু সিদ্দিক জামাল নামে একজন দাবি করেন যে তিনি দাস পরিবার থেকে ১৯৭১ সালে রঘুনাথের অংশটি কিনে নিয়েছেন। সেই সুবাদে তিনি দ্বিতীয় তলায় বসবাস শুরু করেন। তারই সূত্র ধরে সিদ্দিক জামালের মৃত্যুর পর তার ছেলে দাউদ জামাল ১৯৭৩ সালে ভারতে চলে যান। এরপর নুরজাহান ও তার স্বামী দাবী করেন যে, এই অংশটি তাদের এবং তারা বর্তমানে বাড়িটির দখলে আছেন। তারা এখানে গত ত্রিশ বছর ধরে বসবাস করছেন।

দোকান পাঠে নিচতলা পুরো ঢেকেই গিয়েছে। সোর্স: রিসাত

রূপলাল দাসের অংশটিতে প্রিন্স করিম আগাখান প্রিপারেটরী স্কুল চালু হয় ১৯৫৮ সালে। ১৯৭৩ সালে তা কলেজে উন্নীত করলেও মাত্র ১৬ দিনের মাথায় তা গুটিয়ে ফেলা হয়। এরপর ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ সরকার রক্ষীবাহিনীর জন্য বাড়িটি রিক্যুইজিশন করে। রক্ষীবাহিনীর বিলুপ্তির পর ১৯৭৬ সালে রূপলাল হাউজকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে পূর্ত মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

বলা হয়ে থাকে, তখনকার যুগের অত্যন্ত ব্যয়বহুল স্থাপনা এই রূপলাল হাউস। রূপলাল হাউজের ডিজাইন করেছিলেন কলকাতার মার্টিন কোম্পানি। দ্বিতল এই ভবনের স্থাপত্যশৈলী অভিনব। এটি দুইটি অসম অংশে বিভক্ত যার প্রতিটিতে কিছুটা ভিন্ন ধরনের স্থাপত্যশৈলী দেখা যায়। এর ভিত্তিভূমি ইংরেজী E অক্ষরের ন্যায়।, যার বাহুত্রয় শহরের দিকে প্রসারিত। মাঝের দীর্ঘতম বাহুটির দৈর্ঘ্য ১৮.৩৩ মিটার। ভবনটির ছাদ নির্মাণ করা হয়েছিল ‘কোরিনথীয়’ রীতিতে। এই বাড়ির র্দৈঘ্য ৯,১৪৪ মিটার। প্রস্থ ১,৮৩০ মিটার। দোতলা বাড়িটির দুটি ব্লকে বিভিন্ন সাইজের ৫০টি কক্ষ আছে। ঠিক মাঝখানে কাঠের নৃত্য মঞ্চ। স্থাপত্য নকশায় এ ভবনটিতে এখনো যথেষ্ট বৈচিত্র্য এবং কারুকাজ বিদ্যমান।

চতুষ্ক বাড়ির দোতলা। সোর্স: তাসমিয়া

প্রাচীনতার প্রতি আমার টান মজ্জাগত। এতসব সমৃদ্ধ ইতিহাস শুনে গিয়েছিলাম বুড়িগঙ্গার পাড়ে। চাঁদপুরের ঘাটের পাশেই শ্যাম বাজার। বাজারের কাছ ঘেঁষে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। এক সময় গুগল ম্যাপ বললো, ঠিক এখানেই রূপলাল হাউজ। কিন্তু আশেপাশে তো তার কোনো চিহ্নই দেখা যাচ্ছে না! তবে?

বাজারের এক লোককে জিজ্ঞেস করতেই সে বাজারের মধ্য দিয়ে একটা আড়ৎ দেখিয়ে দিল। ওখান দিয়ে এগিয়ে গেলাম। তখনো জানিই না, এই আড়ৎটাই রূপলাল হাউজের নিচতলার একটা অংশ! চারিদিকে অসংখ্য দোকান পাঠসহ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। ভবনটির নিচতলার পুরোটাই চলে গেছে ব্যবসায়ীদের দখলে।

বারান্দায় কাঠের পাত দিয়ে আলপনা করা হয়েছে। সোর্স: তাসমিয়া

আড়ৎ পেরিয়ে হাউজের সামনের উঠোনে এলাম। এত্ত বড়, কল্পনাও করিনি! ভিতরে ঢুকতে যাব, একটা লোক বাঁধা দিল। গেটের গায়ে একটা নোটিশ পেপারের দিকে দেখিয়ে বললো, “এটা আর্মির আন্ডারে। যাওয়া যাবে না।” ওটায় লেখা ছিল, “এ বাড়িটি বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত।”

তবুও বার বার অনুরোধ করে বললাম, “আমরা অনেক দূর থেকে এসেছি।”

আমাদের অনুরোধ উপরোধ শুনে যেন দয়া করে ভিতরে ঢুকতে দিল। কিন্তু সেই সাথে এও বলে দিল, “উপরে যাওয়া নিষেধ!”

দরজা ঠেলে ঢুকে দেখি, পুরো বাড়িটি অন্ধকারে আচ্ছন্ন। গেট দিয়ে ঢোকার পরেই উপরে ওঠার কাঠের সিঁড়ি। খুব ইচ্ছে করলো উপরে যাই। কিন্তু সব ইচ্ছে চাইলেও পূরণ করা যায় না।

বারান্দা। সোর্স: তাসমিয়া

মাঝখানের উঠানটায় রোদের আলো পড়ছে। এটা একটা চতুষ্ক বাড়ি। এরকম একটা বাড়ির শখ আমার বহুদিনের। পুরো বারান্দা জুড়ে মানুষের কাপড়-চোপড় মেলে দেওয়া হয়েছে। এই ব্যাপারটাই বাড়ির সৌন্দর্য নষ্ট করে ফেলেছে।

রূপলাল হাউস তার রূপ হারিয়ে ফেলেছে অনেক আগেই। স্থানে স্থানে ভেঙে পড়েছে। মেরামতের কোনো উদ্যোগ নেই। ছাদের কার্নিশে এবং অন্যান্য স্থানে বটগাছ গজিয়েছে। কিন্তু বসবাসকারীরা এখনো নির্বিঘ্নে বসবাস করে যাচ্ছে। বর্তমানে এ ভবনের বিভিন্ন স্থানে কিছু বিজিবি সদস্য নিজ নিজ পরিবার-পরিজনসহ বসবাস করছে। তারা পোস্তগোলাস্থ ১২৪৩ নং খুঁটির সদস্য এবং কমান্ডিং অফিসারের নিয়ন্ত্রনাধীন। উক্ত ভবনে বসবাসকারীদের কোনো ভাড়া পরিশোধ করতে হয় না। বসবাসকারীদের অবস্থা দেখে আমার মনেই হয়নি বিজিবি সদস্যরা এরকম ঘিঞ্জি পরিবেশ তৈরি করতে পারে। জানি না, আসলে কারা এই নান্দনিক সুন্দর বাড়িটা এভাবে দখল করে নষ্ট করছে।

পুরো বাড়ি জুড়ে ভেজা কাপড়ের বাহার। সোর্স: তাসমিয়া

রূপলাল হাউজের বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন মালিকের নামে (জামাল হাউস, আনোয়ারা হাউস ইত্যাদি) সাইন বোর্ড লাগানো হয়েছে। তাদের প্রত্যেকেরই দাবি এই অংশটি তাদের। আমরা “জামাল হাউজ” লেখা সাইনবোর্ডটি দেখেছি। বাড়িতে জাতীয় জাদুঘর স্থাপিত একটি সাইনবোর্ড ছিল, ইতিমধ্যেই ওটা অপসারণ করা হয়েছে।

আমার মনে হয় প্রাচীন এ নিদর্শনগুলো রক্ষা করার জন্য একটি বড় ধরনের বিনিয়োগ করতে হবে যেন ভবন মালিককে একটি ক্ষতিপুরণ দেয়া যায়। পৃথিবীর অনেক দেশে সংরক্ষিত ঐতিহ্যবাহী এলাকা আছে। আমাদের দেশেও এটি করা সম্ভব। এতে করে আমাদের ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি বিদেশি অনেক পর্যটককে আকর্ষণ করা সম্ভব। সরকার যদি এই ব্যাপারগুলোতে দৃষ্টিপাত করতো, আমরা অনেক ভালো ভালো দর্শনীয় স্থান পেতাম।

কীভাবে যাবেন:

সদরঘাটগামী যেকোনো বাসে প্রথমে সদরঘাটে যাবেন। ভিক্টোরিয়া পার্কের সামনে নেমে নর্থব্রুক রোড ধরে হেঁটে গেলে পাঁচমিনিটে লালকুঠি। লালকুঠির বাম পাশের রাস্তা ধরে কিছুদূর এগিয়ে হাতের ডানপাশে একটা সাইনবোর্ড পাবেন “জামাল হাউজ” লেখা। নর্থব্রুক রোড চিনতে না পারলে, আশেপাশের যে কাউকে চাঁদপুরের ঘাটে যাওয়ার রাস্তা বললেই দেখিয়ে দেবে। শ্যামবাজারের কাছ ঘেঁষেও যাওয়া যাবে, সেক্ষেত্রে রূপলাল হাউজের অবস্থান স্থানীয়দের জিজ্ঞেস করে নিতে হবে।

ফিচার ইমেজ:  dhakadailyphoto.com

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
Booking.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *