পৌনে তিন আনি জমিদার বাড়ির কথকতা

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry

কোনো জেলায় বেড়াতে যাওয়ার আগে ভালোভাবে গুগল সার্চ করি যাতে বিখ্যাত জায়গাগুলোর ঝলকানিতে অখ্যাত বা কম জনপ্রিয় জায়গাগুলো মিস হয়ে না যায়।

শেরপুর পৌনে তিন আনি জমিদার বাড়িটি তেমন বিখ্যাত নয়। হয়তো এর নামই শোনেননি আপনি। কিন্তু চমৎকার এই জমিদার বাড়িতে একবার গেলে যেন মনটাই পড়ে থাকবে সেখানে। নিরিবিলি শান্ত পরিবেশ, পর্যটকদের তেমন ভিড় নেই।

জমিদার বাড়ির সামনের অংশ। সোর্স: রনি

আমরা যখন জমিদার বাড়িতে গিয়ে পৌঁছেছি, তখন পড়ন্ত বিকেল। গুগল থেকে জেনেছিলাম নবীনগর গিয়ে যে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই জমিদার বাড়ি দেখিয়ে দেবে। ব্যাপারটা মোটেও তা নয়। পৌনে তিন আনি জমিদার বাড়ির কথা জিজ্ঞেস করার পর কেউ হতবিহবল হয়ে তাকালো, কেউ মাথা চুলকালো, কেউ বা অন্য আরেকজনের কাছে জিজ্ঞেস করতে গেল। এভাবে কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করার পর জানতে পারলাম, জমিদারবাড়ি এখান থেকেও ঢের দূরে। হেঁটে যাওয়া যাবে না মোটেও। অটোয় করে যেতে হবে, তাও দশ টাকা করে ভাড়া।

কী আর করা! উঠে পড়লাম অটোয়। প্রধান প্রবেশপথের মুখের রাস্তায় নামিয়ে দিল অটোওয়ালা। ভাড়া চুকিয়ে রাস্তা পেরিয়ে ভিতরে ঢুকলাম।

দাবাবোর্ডের মেঝে Source: Flickr

জমিদার সত্যেন্দ্র মোহন চৌধুরী ও জ্ঞানেন্দ্র মোহন চৌধুরীর বাড়িকে বলা হয় পৌনে তিন আনি জমিদার বাড়ি। গ্রীক স্থাপত্যের  অনুকরণে নির্মিত স্থাপত্যটি এখনো অক্ষত অবস্থায় সাক্ষ্য বহন করছে জমিদারী আমলের। প্রবেশ করতে কোনো টাকা লাগে না। সুনসান নিরবতা দেখে মনে হচ্ছিল, অনধিকার প্রবেশ করছি না তো?

এ  বাড়িটি নির্মাণ করা হয়েছিল গোপীনাথ মন্দির নির্মাণেরও অনেক আগে। দোতলা বাড়িটির সামনে সুপ্রশস্ত বেদী। বাড়ির প্রবেশপথ পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য অনেকগুলো ধাপ পেরুতে হবে। এই ধাপগুলোতে প্রত্যেক স্তম্ভ বরাবর পাতাবাহার, ক্যাকটাস, নয়নতারা, সন্ধ্যাতারা ফুল গাছের টব দিয়ে সাজানো হয়েছে। গাছভর্তি ফুল দেখে বোঝা গেল বাড়িটার যত্ন করা হয়।

ছাদের কারুকাজ Source: Flickr

প্রবেশদ্বারের দুই প্রান্তে অনেকগুলো অলংকৃত স্তম্ভ। স্তম্ভগুলোর নিচ থেকে উপর পর্যন্ত কারুকাজ খচিত নকশা। কার্ণিশেও বিভিন্ন প্রকারের মোটিভ ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে ভবনটি অনেক আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। চারপাশের স্তম্ভগুলো চতুষ্কোণ বিশিষ্ট এবং এতে বর্গাকৃতি ফর্ম ব্যবহার করা হয়েছে। চমৎকার নকশা করা স্তম্ভগুলো মুগ্ধ করবে যেকোনো দর্শনার্থীকে।

বাড়ির আস্তরণ ও পলেস্তারে চুন ও সুরকি ব্যবহার করা হয়েছে। ছাদগুলোতে গতানুগতিকভাবে দেওয়া হয়েছে লোহার রেলিংয়ের সাথে  চুন-সুরকির ঢালাই। মেঝে আর দেয়ালের খানিকটা অংশ জুড়ে দাবা বোর্ডের টাইলস করা। এগুলো সম্ভবত পরে করা হয়েছে।

বাড়িটার যত্ন করা হলেও আশপাশের জায়গার কোনো পরিচর্যা করা হয় না। জমিদার বাড়ির সামনের অংশটুকু ঢালাই করা। ওটুকু পরিচ্ছন্নই আছে। কিন্তু তার পাশের জায়গাতে প্রচুর আগাছা জন্মে আছে। বাড়িটার সুন্দর একখানা ছবি তোলার জন্য সেদিকে পা বাড়াতেই পিছন থেকে ওরা সবাই হা হা করে উঠলো এই বলে যে, আমি যেন জঙ্গলের দিকে না যাই। ওখানে সাপখোপ থাকতে পারে!

পুকুর পাড় সোর্স: রনি

বাড়ির সাথে আছে একটি সুন্দর পুকুর। জমিদার বাড়ি আর পুকুরের মাঝখানে একটুখানি জায়গা ছিল হাঁটার মতো। সেদিকে যেতে চাইলাম। কিন্তু বাঁধা হয়ে দাঁড়ালো নতুন করে বানানো একটা দেয়াল। এখান দিয়ে কেউ যেন না যেতে পারে, সেজন্য দেয়ালটি বানানো হয়েছে পরে।

যেকোনো জমিদার বাড়ির ছাদ আমাকে খুব টানে। সামনে থেকে দেখে মনে হয়েছে এটার ছাদ হয়তো এখনো আস্তই আছে। একটা বাউন্ডারি দিয়ে ঘিরে দেওয়া আছে বাড়ির পাশ ঘেঁষে। ওই বাউন্ডারির ধার দিয়ে এগিয়ে গেলাম বাড়ির পিছন দিকে। সিঁড়ির খোঁজে সেদিকে গিয়ে আবারোও হতাশ হতে হলো। সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে একইভাবে দেয়াল টেনে দেওয়া হয়েছে। ওটুকুতেই ক্ষান্ত হয়নি, বরই কাঁটার ডাল ফেলে রেখেছে ওখানে।

শান বাঁধানো ঘাট। সোর্স: রনি

তবে পুকুর ঘাটটি যেন এখনো আগের মতোই আছে। ঘাটের ডানপাশের নকশা করা দেয়ালটা ভেঙে গেলেও বামপাশেরটা বহাল তবিয়তেই আছে।

এই বাড়ির শেষ দুই জমিদারের একজন- জ্ঞানেন্দ্র মোহন চৌধুরী ছিলেন চিরকুমার। অপরজন সত্যেন্দ্র মোহন চৌধুরী ছিলেন উচ্চ শিক্ষিত। দুজনেই খুব সৌখিন ছিলেন। আর বিলাসিতা তো জমিদারদের রন্ধ্রগত। তবে এদের একটা ভালো গুণ ছিল। দেশ-বিদেশ থেকে বিভিন্ন ধরনের গাছ এনে লাগিয়েছিলেন বাড়ির চারধারের খালি জায়গায়। মজার ব্যাপার হলো, এদের বৃক্ষপ্রীতি এত বেশি প্রবল যে এরা স্বর্ণের তালগাছ পর্যন্ত বানিয়েছিল!

জমিদারবাড়ির পিছনের সিঁড়ি। Source: Flickr

বিভিন্ন প্রজাতির গাছের ফলে ১৯৫৭ সাল অর্থাৎ বিংশ শতাব্দীতে এই জায়গাটিতে কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপিত হয়। পুকুরের অপর পাড়ে কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের লাল দালানটি দাঁড়িয়ে আছে। এছাড়াও জমিদারবাড়ির খালি জায়গায় বানানো হয়েছে কিছু ছাত্রাবাস। ছাত্রাবাসে বসবাসরত কয়েকজনের সাথে দেখা হলো। তাদের সাথে কথা বলে জেনে নিলাম অনেক তথ্য।

বাড়ির নাম কিংবা জমিদারদের নাম “পৌনে তিন আনি” কেন, ভেবে পাচ্ছিলাম না। এই নিয়ে ঘাঁটাঘাটি করতেই বেরিয়ে পড়লো মজার সব তথ্য। শুধু পৌনে তিন আনি নয়, আরোও কয়েক আনি আছে এই জমিদার বাড়ির ইতিহাসে। সেসব নিয়ে বিস্তারিত লিখব অন্য কোনো পোস্টে।

পুকুর পাড় থেকে জমিদার বাড়ি Source: Flickr

কীভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে নিজস্ব বাহনে শেরপুর আসতে সময় লাগে মাত্র সাড়ে ৩ ঘণ্টা। আবার শেরপুর থেকে মধুটিলা ইকোপার্কের দূরত্ব ২৭ কিলোমিটার। ঢাকার মহাখালী টার্মিনাল থেকে ড্রিমল্যান্ড বাসে শেরপুর আসা যায়। ভাড়া ১৯০ টাকা। এখান থেকে সকাল সাড়ে ৭টায় সাদিকা গেটলক বাস ছাড়ে। দুপুর দেড়টায় ছাড়ে এসি বাস। এসি বাসের ভাড়া ২২০ টাকা।

ভুল করেও স্পেশাল ড্রিমল্যান্ড ছাড়া অন্য গাড়িতে উঠবেন না। এসব ছাড়া অন্য বাসগুলো লোকাল। লোকাল বাসে সময়ও লাগে বেশি, ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা। শেরপুর নবীনগর বাসস্ট্যান্ডে নেমে অটো নিয়ে সোজা চলে যেতে পারেন জমিদার বাড়ির গেটে।

ফিচার ইমেজ সোর্সঃ Flickr 

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
Booking.com

2 Comments

Leave a Reply
  1. আপনার দেয়া “ঢাকার মহাখালী টার্মিনাল থেকে ড্রিমল্যান্ড বাসে শেরপুর আসা যায়। ভাড়া ১৯০ টাকা। এখান থেকে সকাল সাড়ে ৭টায় সাদিকা গেটলক বাস ছাড়ে। দুপুর দেড়টায় ছাড়ে এসি বাস। এসি বাসের ভাড়া ২২০ টাকা।

    ভুল করেও স্পেশাল ড্রিমল্যান্ড ছাড়া অন্য গাড়িতে উঠবেন না। এসব ছাড়া অন্য বাসগুলো লোকাল।” এই তথ্যটি ভুল এবং অনেক আগের। বর্তমানে ঢাকা টু শেরপুর ননএসির ভাড়া ৩০০টাকা, এসি ৪০০টাকা। আর ড্রিমল্যান্ড বাস এখন আর আগের সার্ভিস নেই। https://sherpurnews24.com/%E0%A6%B6%E0%A7%87%E0%A6%B0%E0%A6%AA%E0%A7%81%E0%A6%B0-%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%B8-%E0%A6%AE%E0%A7%8B%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%B2/2018/

  2. বাড়িটির নাম কেনো পৌনে তিন আনি…Plz জানাবেন কিন্তু?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *