জোড় বাংলা ঢিবি: এক গম্বুজ বিশিষ্ট বিশাল জোড় বাংলা মসজিদ

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
11

প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং অতীত ঐতিহ্যের প্রতি আমার বিশেষ দুর্বলতা আছে। এই দুর্বলতা থেকেই ঝিনাইদহের বারোবাজারে ঐতিহাসিক সব প্রত্নস্থান পরিদর্শন করেছি পর্যায়ক্রমে। ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজার হলো দেশের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ এবং বিখ্যাত প্রত্নস্থানগুলোর মধ্যে একটি। এই প্রত্নস্থান পরিদর্শন করে ইতোমধ্যে আমি দুটি মসজিদ নিয়ে আলাদা আলাদা নিবন্ধ লিখেছি। গোড়ার মসজিদ এবং গলাকাটা দিঘী ঢিবি মসজিদের পর এবার আমাদের গন্তব্য জোড়বাংলা মসজিদ।

জোড় বাংলা মসজিদ, বারোবাজার, ঝিনাইদাহ। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

জোড়বাংলা মসজিদটি খুঁজে পাওয়ার গল্প ইতিপূর্বে বলা গোড়ার মসজিদ বা গলাকাটা মসজিদের চেয়ে আরও বেশি রোমাঞ্চকর। গলাকাটা মসজিদ দেখার পর মাত্র এক থেকে দেড় কিলোমিটার পথ এগোলেই দেখা মেলে জোড়বাংলা মসজিদের।

দীর্ঘদিন ধরে রাস্তার পাশে একটা উঁচু ঢিবি ছিল। স্থানীয় লোকজন বহুদিন ধরে দেখে আসছে এই ঢিবি। বারোবাজারের আর সব প্রত্নস্থানগুলোর মতো এই মসজিদটিও মাটির নিচে চাপা পড়ে ছিল। স্থানীয় লোকজন এই ডিবিকে জোড় বাংলা ঢিবি বলে জানতো। প্রশ্ন হলো, মসজিদ যখন আবিষ্কৃত হয়নি তখন জোড়বাংলা নাম কোথা থেকে এলো? আমি যখন প্রথম জোড়বাংলা মসজিদ সম্বন্ধে জেনেছিলাম, তখন আমার মাথায়ও এমন প্রশ্ন উদয় হয়েছিল।

জোড় বাংলা মসজিদ, বারোবাজার, ঝিনাইদাহ। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

আসলে জোড়বাংলা মসজিদের নামকরণের সঠিক ইতিহাস জানা যায় না। তবে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে দুই রকমের কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। কিছু মানুষ বলে থাকে এই স্থানে বহু বছর আগে এক জোড়া কুঁড়ে ঘর ছিল। তাই এই নাম অনুসারেই স্থানীয় ঢিবির নামকরণ করা হয় জোড় বাংলা ঢিবি।

আবার কারো কারো মতে এখানে জোড়া দীঘি ছিল। তাই এর নামকরণ করা হয় জোড় বাংলা ঢিবি। ১৯৯২-৯৩ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বারোবাজারের অন্যান্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আবিষ্কার করার মতো এখানেও খনন কাজ চালায় এবং আবিষ্কৃত হয় এক গম্বুজ বিশিষ্ট একটি সুদৃশ্য মসজিদ। যেহেতু এই ঢিবির নাম ছিল জোড় বাংলা ঢিবি, তাই মসজিদের নাম হয় জোড়বাংলা মসজিদ।

জোড় বাংলা মসজিদের দেয়ালের নকশা, বারোবাজার, ঝিনাইদাহ। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

গলাকাটা মসজিদ দেখার পর আমি আর ডাক্তার বেল্লাল চাচা বাইকে চেপে চলেছি জোড় বাংলা মসজিদের দিকে। দু’পাশের সবুজ কেটে এগিয়ে চলা পিচঢালা পথ বেয়ে চলেছি আমরা। পৌঁছানোর আগেই জোড় বাংলা মসজিদ সম্বন্ধে শোনা নানা জনের নানা কথা মনে পড়তে লাগল আমার।

অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম জোড় বাংলা মসজিদে। দিনের শুরুতে কয়েক দফা বৃষ্টি হলেও, এখন একদম বৃষ্টির ছিটেফোঁটা নেই। তাই জোড়বাংলা মসজিদে পৌঁছেই সূর্যের উজ্জ্বল আলোকচ্ছটায় মসজিদের এক অপরূপ সৌন্দর্য চোখে পড়ল।

জোড় বাংলা মসজিদের পশ্চিম দেয়াল। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা হিজরী ৮০০ সনে আলাউদ্দিন হুসাইন শাহের ছেলে শাহ সুলতান মাহমুদ এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। তবে এ ব্যাপারে সঠিক কোনো ইতিহাস জানা যায় না। তাছাড়া মসজিদের পাশেই রয়েছে বেশ কয়েকটি কবর। এই কবরে কাদের সমাহিত করা হয়েছিল, তারও কোনো সঠিক ইতিহাস নেই।

জোড় বাংলা মসজিদের ঠিক উত্তর পাশে অন্ধপুকুর নামে একটি পুকুর রয়েছে। মসজিদ এবং পুকুরের মাঝে স্থানীয় লোকজনের চলাচলের জন্য তৈরি করা হয়েছে পাকা রাস্তা। মুসল্লিদের অজু-গোসলের জন্য এই পুকুর নির্মাণ করা হয়েছিল। অবশ্য যখন মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল এবং পুকুর খনন করা হয়েছিল তখন মাঝখানের এই রাস্তাটা ছিল না।

জোড় বাংলা মসজিদের গম্বুজ। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

বারোবাজারের অন্যান্য মসজিদের মতো জোড় বাংলা মসজিদটিও দেখতে অসাধারণ। প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো এই মসজিদটি ছোট ছোট পাতলা ইটের গাঁথুনিতে নির্মিত। সম্পূর্ণ মসজিদটি দাঁড়িয়ে আছে ১১ ফুট উঁচু একটি প্লাটফর্মের উপর। মসজিদ এবং পুকুরের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা রাস্তায় দাঁড়ালে শুরুতেই যে প্রবেশদ্বার চোখে পড়ে, তার ঠিক উত্তর-পূর্ব কোণে মসজিদটি অবস্থিত।

এই প্রবেশপথ থেকে পুকুর পর্যন্ত বাঁধানো সিঁড়ি ছিল। যদিও বর্তমানে সেই সিঁড়ির কোনো অস্তিত্ব নেই। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মসজিদটি নতুন করে সংস্কার করেছে। ভেঙে যাওয়া মসজিদটি পুনঃনির্মাণের পর যেন তার পূর্বের জৌলুস ফিরে পেয়েছে।

জোড় বাংলা মসজিদের মেম্বর। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

গোটা বারোবাজার জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মসজিদগুলোর প্রায় সবকটি বর্গাকৃতির। গোড়ার মসজিদ এবং গলাকাটা মসজিদের মতো জোড় বাংলা মসজিদও বর্গাকৃতির। এক গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদটির ঠিক পূর্ব পাশে রয়েছে তিনটি খিলান যুক্ত প্রবেশ পথ। মসজিদের পশ্চিম দিকের দেয়ালে পোড়ামাটি নির্মিত অলংকরণের অর্ধবৃত্তাকার তিনটি মেহরাব আছে।

জোড় বাংলা মসজিদ, বারোবাজার, ঝিনাইদাহ। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

বর্গাকৃতির মসজিদের চার কোনায় রয়েছে ৮ কোণ বিশিষ্ট চারটি কারুকাজ করা সুদৃশ্য মিনার। টাওয়ারের মতো মিনারগুলো মসজিদের সৌন্দর্য বাড়িয়েছে বহুগুণ। প্রত্নতাত্ত্বিকরা গবেষণা করে দেখেছেন, এই মসজিদটির ইটের গাঁথুনির জন্য চুন ও বালি ব্যবহার করা হয়েছিল।

মসজিদের ভেতরে কেন্দ্রীয় মেহরাব সহ পশ্চিম দেয়ালে ফুল ও লতা পাতার কারুকাজ মুসল্লিদের চোখে এই মসজিদকে আরো দৃষ্টিনন্দন করে তোলে। বর্তমানে এই মসজিদে নিয়মিত নামাজ আদায় করা হয়। বারোবাজারের অনন্য এই মুসলিম স্থাপত্য সুলতানি আমলে বাংলার মুসলমানদের রুচিশীলতার পরিচয় বহন করে।

জোড় বাংলা মসজিদ, বারোবাজার, ঝিনাইদাহ। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

বারোবাজারের অন্যান্য মুসলিম স্থাপত্যগুলোর সাথে দেখে আসতে পারেন এই জোড় বাংলা মসজিদ। কথা দিচ্ছি, ৫০০ বছর পুরনো এক ঐতিহ্যের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাবেন।

কীভাবে যাবেন

ঢাকার গাবতলী থেকে ঝিনাইদহগামী যেকোনো বাসে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছানো যাবে ঝিনাইদহে। তারপর ঝিনাইদহ থেকে কালিগঞ্জ পার হয়ে যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়কের বারোবাজার পৌঁছাতে হবে। অথবা ঢাকা থেকে বিমানযোগে যশোর বিমানবন্দর পৌঁছে যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়ক ধরে বারোবাজার পৌঁছানো যাবে।

ঝিনাইদহ বা যশোর থেকে বারোবাজার পৌঁছাতে স্থানীয় রুটে চলাচলকারী যে কোনো বাসে চেপে বসলেই চলবে। বারোবাজার পৌঁছানোর পর ইজিবাইক, ভ্যান, মোটরসাইকেল বা ব্যাটারি চালিত রিকশায় চেপে পৌঁছানো যাবে জোড়বাংলা মসজিদে।

প্রচ্ছদ ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
11
Booking.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *