কুয়াকাটায় সমুদ্রস্নান: বাজেট ট্রিপের আদ্যোপান্ত

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
15

বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় “বদ্বীপ”গুলোর মধ্যে একটি। এই দেশ বঙ্গোপসাগরের দেশ। এই দেশে যেমন রয়েছে পাহাড় পর্বতে ঘেরা সবুজের সমারোহ তেমনি রয়েছে নোনা পানির সমুদ্র নীলিমা। দেশের বিখ্যাত সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, পতেঙ্গা সীবিচ, ইনানী সীবিচ ইত্যাদি চট্টগ্রামের দিকে অবস্থিত। তবে নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশের নদীবিধৌত বিভাগ বরিশালের দিকে সমুদ্রবিলাসের সুযোগ থাকবে না এটা হয় না। বলছি দেশের আরেকটি বিখ্যাত সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটার কথা।

পটুয়াখালির কলাপাড়া উপজেলার অন্তর্গত এই সমুদ্রসৈকত বাকি সমুদ্রসৈকতগুলো থেকে একটু অন্যরকম। অফ সিজনে কুয়াকাটার মতো শান্তির জায়গা খুব কমই পাওয়া যাবে বাংলাদেশে। হাতে গোনা পর্যটক আর হোটেল থেকে শুরু করে খাবার দাবারের দাম সব কিছুই হাতের নাগালে কুয়াকাটায়। চলুন তাহলে শুরু করা যাক কুয়াকাটার গল্প যা একজন বাজেট ট্রাভেলারকে সহায়তা করবে অনেকখানি।

ছবিঃ লেখক

আপনি যেখান থেকেই আপনার কুয়াকাটা যাত্রা শুরু করতে চান না কেন আপনাকে আগে বরিশাল চলে আসতে হবে। ঢাকা থেকে বরিশালের ভাড়া সাধারণত ৪০০-৬০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। তবে সরাসরি কুয়াকাটার বাস ছাড়ে কিনা জিজ্ঞেস করে নিতে ভুলবেন না। খুলনা থেকে কুয়াকাটার সরাসরি বাস ছাড়ে সেভেন স্টার আর কুয়াকাটা এক্সপ্রেস। এই রুটের বাসগুলোর মধ্যে যথেষ্ট ভালো সার্ভিস দেয় এই বাসগুলো।

এই দুটি বাস মূলত ছেড়ে আসে বেনাপোল থেকে সন্ধ্যা ৬টায়। খুলনা থেকে কুয়াকাটা বাস ভাড়া ৫০০ টাকা, ছেড়ে যায় রাত ৯টা ৪৫ এ। যদি আপনার বাসা খুলনা বা বরিশাল হয় তবে তো ঝামেলা মিটেই গেল, আর যদি অন্য কোথাও হয় তবে প্রথমে বরিশাল চলে আসুন, সেখান থেকে লোকাল বাসে সরাসরি কুয়াকাটা। বরিশাল থেকে কুয়াকাটার ভাড়া ২৪০ টাকা।

পর্যটন মোটেল, ছবিঃ লেখক

আমরা কয়েকজন মিলে খুলনা থেকে কুয়াকাটা এক্সপ্রেসের টিকেট কাটি গত বছরের অক্টোবরের দিকে। যেহেতু বাস বেনাপোল থেকে ছেড়ে আসে তাই সাধারণত একটু দেরী করে এটি। সাড়ে দশটায় বাস আসে আমাদের। সময়টা অফ সিজন ছিল। তাই হোটেল বুকিং দেইনি ইচ্ছে করে।

রাতের বাস বলে ঘুমিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েই বাসে উঠেছিলাম। বাসে উঠে আধ ঘণ্টার মধ্যে সবাই ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেলাম। ঘুম ভাঙলো সুপারভাইজারের ডাকে। ভোর হয়ে গেছে ততক্ষণে, কুয়াকাটা চলে এসেছি আমরা।

ছবিঃ লেখক

কুয়াকাটায় অফ সিজনে হোটেলগুলোতে ভালোই ছাড় দেয়। কুয়াকাটার সবচেয়ে ভালো হোটেল (অবস্থান আর সুযোগ-সুবিধার বিচারে) এখানকার পর্যটন মোটেল। বেশ বড়সড় এলাকা নিয়ে তৈরী করা এই হোটেলের রুমগুলোও বেশ ভালো। এছাড়াও বেশ কয়েকটি হোটেল আছে ভালো কুয়াকাটায়, পর্যটনের খুব কাছেই হোটেল মোহনা তাদের মধ্যে একটি।

অফ সিজনে এদের নন এসি রুমের ভাড়া ১,২০০ টাকা, অন সিজনে ২,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকা। আমরা প্রতি রুম ১,২০০ টাকা করে পর্যটন মোটেলের নন এসি দুটো রুম নিয়ে নিলাম। প্রতিরুমে তিন থেকে চারজন থাকা যায়।

লেবুর চর, ছবিঃ লেখক

ইচ্ছে করলে এক দিনেই কুয়াকাটা ভ্রমণ শেষ করা সম্ভব। আর যদি একটু আরাম করে ভ্রমণ করতে ইচ্ছুক হয়ে থাকেন তবে হাতে সময় রাখুন সর্বোচ্চ দুই দিন। কুয়াকাটায় তাই ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান হতে পারে দুইরকম, এক দিনের প্ল্যান এবং দুই দিনের প্ল্যান।

এক দিনের প্ল্যান:

এক দিনে কুয়াকাটা ঘুরতে চাইলে সকালের দিকে হোটেল রুম নিয়ে নিন। ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করে নিন বাজারের দিকের হোটেলগুলোয়। নাস্তা শেষে একটু সামনের দিকে এগিয়ে গেলে কুয়াকাটা বাসস্ট্যান্ড পাবেন যেখানে আজকে সকালেই আপনার বাস আপনাকে নামিয়ে দিয়েছিল। সেখানে অনেক ভ্যান আর মোটরসাইকেলের সন্ধান মিলবে। সকাল বেলায় আপনার গন্তব্য হবে এখানকার ফিশ ফ্রাইয়ের জন্য বিখ্যাত লেবুর চরে।

মোটরসাইকেলে দুইজন যাওয়া এবং আসায় ভাড়া নেবে ১৫০ টাকা আর ভ্যানে চারজন হলে ৩০০ টাকা এবং দুইজন থাকলে ১৫০ টাকা ভাড়া যাওয়া-আসা। লেবুর চর থেকে ফিরে এসে খাওয়া-দাওয়া করুন বাজারের হোটেলগুলোতে। রুপচাঁদা থেকে শুরু করে টুনা পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকার সামুদ্রিক মাছ বেশ ন্যায্য দামে পেয়ে যাবেন। খাওয়া-দাওয়া শেষে হোটেলে গিয়ে বিশ্রাম নিন। বিকালের দিকে মোটরসাইকেল ভাড়া করুন লাল কাকড়ার চর আর বৌদ্ধ মন্দিরে যাওয়ার জন্য। বৌদ্ধ মন্দির কুয়াকাটার খুব কাছেই, মূলত ভ্রমণটি লাল কাকড়ার চরের উদ্দেশ্যে করা হয়।

প্রতি মোটরসাইকেলে আসা-যাওয়ার ভাড়া ৪০০ টাকা। ব্যস তাহলে জনপ্রতি হোটেল ভাড়া ৫০০ টাকা, তিনবেলার খাবার খরচ ৪০০ টাকা, লেবুর চরের যাতায়াত খরচ ৭৫ টাকা, সেখানে গিয়ে ফিশ ফ্রাই চেখে দেখলে ২০০ টাকার মতো আর লাল কাকড়ার চরে মোটরসাইকেল ভাড়া ২০০ টাকা সব মিলিয়ে ১,৪০০ টাকার মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে কুয়াকাটা ভ্রমণ। উল্লেখ্য যে, কুয়াকাটা আসা-যাওয়ার ভাড়া এখানে বলা হয়নি কারণ খরচটা একেক ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। যেদিন চলে আসবেন সেদিন খুব ভোরে বাজারের কাছে যে সৈকতটি আছে সেখান থেকে সূর্যোদয় দেখতে ভুলে যাবেন না।

দুই দিনের প্ল্যান:

তাড়াহুড়ো না করে ধীরে সুস্থে কুয়াকাটা ভ্রমণ উপভোগ করতে চাইলে হাতে রাখুন সর্বোচ্চ দুইদিন। ভ্রমণ পরিকল্পনা এক দিনের পরিকল্পনার মতোই, শুধুমাত্র পরিবর্তন হবে প্রথম দিনেই সব দেখে ফেলার বদলে প্রথম দিন বিকেলে লেবুর চর আর তারপর দিন বিকেলে লাল কাকড়ার চরে যেতে পারেন। এক্ষেত্রে প্রথম দিনের তুলনায় খরচের পরিমাণ বাড়বে অতিরিক্ত একদিনের খাবারের খরচে আর হোটেল ভাড়ায় যা আনুমানিক হিসেবে দাঁড়ায় প্রায় ২,২০০ টাকার মতো।

লেবুর চর, ছবিঃ লেখক

আমরা দুইদিনের প্ল্যানই বেছে নিলাম। প্রথম দিন বিকেলে চলে গেলাম লেবুর চরে। লেবুর চরে যাওয়ার রাস্তাটি গ্রামের মেঠো পথ জাতীয় রাস্তা। কুয়াকাটা বাজার থেকে লেবুর চর যেতে সময় লাগে ২০-২৫ মিনিট ভ্যানে, মোটরসাইকেলে আরো কম। লেবুর চর মূলত পর্যটকদের কাছে বিখ্যাত ফিশ ফ্রাই অর্থাৎ মাছ ভাজার জন্য। কাঁকড়া, টুনা, চিংড়ি, রুপচাঁদা সহ বিভিন্ন প্রকার সামুদ্রিক মাছ পাওয়া যায় এখানে। মাছ পছন্দ করে দিলে সেখানেই ভেজে দিবে তারা।

মাছ ভাজা তো বটেই, লেবুর চরের সমুদ্রসৈকত আমার মতে কুয়াকাটার অন্যতম সুন্দর সৈকত। ঝিনুক ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সেই সৈকতের নীলাভ পানিতে সূর্যাস্তের রক্তিম আভা যেন অপার্থিবতার জন্ম দেয়। সৈকতপাড়ের তুমুল বাতাস জানান দেবে আপনি কুয়াকাটায় আছেন। লেবুর চরের মাটি তুলনামূলক শক্ত, তাই বন্ধুরা মিলে ফুটবলও খেলে নেয়া যায় সেখানটায়।

লেবুর চরে কাকড়ামেলা, ছবিঃ লেখক

আমরা পরেরদিন দুপুরের একটু পরে রওনা দিলাম লাল কাঁকড়ার চরের দিকে। লাল কাঁকড়ার চরে যাওয়ার মোটরসাইকেল ভ্রমণটি মনে রাখার মতো। একপাশে সমুদ্র রেখে সৈকতের বালি চিরে মোটরসাইকেলের চাকা গড়াবে প্রচন্ড গতিতে। বেশ রোমাঞ্চ কাজ করে ব্যাপারটায়। মাঝখানে মোটরসাইকেল থেকে নেমে নৌকা দিয়ে ছোট নদীও পার হতে হয়। বড় বড় শ্বাসমূলে ঘেরা বিস্তৃর্ণ সে প্রান্তর সবুজাভ তারুণ্যের জয়গান গায় সুউচ্চ স্বরে।

লাল কাঁকড়ার চরে যখন পৌঁছাই তখন বিকেল অনেকটা পড়ে গেছে। বালির উপর রোদ পড়লে নাকি লাল কাঁকড়ার দেখা মেলে। রোদ ছিল না তেমন, তবুও ছোট ছোট প্রচুর লাল কাঁকড়ার দেখা পেয়ে গেলাম। কাছে গেলেই বালির গর্তে ঢুকে যাচ্ছিলো কাঁকড়াগুলো। তাই ছবি তোলার সামর্থ্যটুকু হয়ে ওঠেনি। ঘুরে বেড়ানোর মতো বেশ জায়গা এই লাল কাঁকড়ার চর। বেশ খানিকটা সময় কাটিয়ে আমরা ফেরার পথ ধরি।

লাল কাকড়ার চর, ছবিঃ লেখক

ফেরার পথে কুয়াকাটার কাছাকাছি মোটরসাইকেল থামানো হলো একটা জায়গায়। জায়গাটির নাম মিস্ত্রিপাড়া। এখানে আছে কুয়াকাটার অন্যতম আকর্ষণ “সীমা বৌদ্ধ মন্দির”। মন্দিরের ভেতর ঢুকতে যতদূর মনে পড়ে কোনো টিকেট কাটা লাগে না। তবে পবিত্রতা আর নিঃশব্দতা বজায় রাখা খুব জরুরী সেখানে।

জুতা খুলে মন্দিরের ভেতর যখন ঢুকি তখনো চিন্তা করিনি এত বড় বৌদ্ধ মূর্তি দেখতে পাবো। উচ্চতাটা জানা হয়নি, কিন্তু বেশ দৃষ্টিনন্দন আর পবিত্রতায় মোড়ানো ছিল সোনালি সে বৌদ্ধ মন্দির। বৌদ্ধ মন্দির দর্শন শেষে ফিরে আসি মূল কুয়াকাটা বাজারে। সেখান থেকে ফিরে যাই হোটেলে।

সীমা বৌদ্ধ মন্দির, ছবিঃ লেখক

পরদিন সকাল দশটার দিকে হোটেল থেকে চেক-আউট করে বের হয়ে গেলাম সবাই। কুয়াকাটা থেকে কিছুক্ষণ পর পরই বাস ছাড়ে বরিশালের উদ্দেশ্যে। সরাসরি খুলনার বাস না পাওয়ায় ২৪০ টাকা দিয়ে উঠে পড়ি বরিশাল যাওয়ার লোকাল বাসে। বরিশাল থেকে আবার খুলনার বাস ধরি। আর এভাবেই শেষ হয় আমাদের কুয়াকাটা বাজেট ট্যুর।

কুয়াকাটা ছোট জায়গা, পুরো এলাকা ঘুরে দেখতে খুব বেশি সময় লাগার কথা নয়। তবে এলাকাটি একটু অগোছালো, যাকে গুছিয়ে রাখার দায়িত্বও কিন্তু আমাদের। তাই আসুন শুধু কুয়াকাটা নয় যেকোনো স্থানে ভ্রমণকালে সে জায়গাটা পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব নিই, গুছিয়ে তুলি সাধ্যমতো। ভ্রমণ হোক পরিষ্কার ও প্রাঞ্জল।

ফিচার ইমেজ- লেখক

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
15
Booking.com

One Comment

Leave a Reply
  1. ভাই আপনি যে বাস গুলোর কথা বলছেন।এর চেয়েও অনেক ভালো মানের বাস সরাসরি ঢাকা কুয়াকাটা যাচ্ছে।সে গুলো তুলে ধরা উচিত ছিলো।যেমন ঢাকা কুয়াকাটা সাকুরা এসি/ নন এসি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *