এক নজরে একটি জেলা: বরিশালের ধর্মশালার গল্প

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
31

আইতে শাল, যাইতে শাল। তাঁর নাম বরিশাল। কিংবদন্তি রয়েছে পূর্বে এখানে প্রচুর পরিমাণে বড় বড় শাল গাছ জন্মাত; আর এ কারণেই এই জায়গার নাম হয় বরিশাল। আবার কেউ কেউ মনে করেন, বরিশাল নামকরণের পেছনে রয়েছে পর্তুগীজ বেরি ও শেলির প্রেম কাহিনী। সে যাই হোক, আমার মূল উদ্দেশ্য এর নামকরণের ইতিহাস ঘাঁটা নয়; এখানে যে দর্শনীয় স্থানগুলো রয়েছে তাঁর বর্ণনা দেওয়া।

কীর্তনখোলা নদীর তীরে অবস্থিত বরিশাল জেলায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে প্রাচীন স্থাপত্যও; যেমন: জমিদার বাড়ি, জমিদারদের নির্মিত মন্দির, মাজার, মসজিদ, গির্জা প্রভৃতি। এগুলোর মধ্যে থেকে আমি আজ বর্ণনা করছি এমন কিছু ঐতিহাসিক স্থাপত্য নিয়ে, যা বরিশালের ধর্মীয় বৈচিত্র্যের সাক্ষ্য বহন করে।

অক্সফোর্ড মিশন গির্জা

অক্সফোর্ড মিশন গির্জা; Source: Bangladesh Unlocked

গির্জাটিকে দূর থেকে দেখতে ট্রেনের ইঞ্জিনের মতো মনে হয়। আর কাছে গেলেই দেখা যায় বিশ্বাসের রূপক ট্রেন অক্সফোর্ড মিশন গির্জা। এটি এশিয়া মহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম গির্জা এবং বাংলাদেশের একটি অন্যতম দৃষ্টিনন্দন পুরাকীর্তি।

গির্জাটি সাধারণের নিকট অক্সফোর্ড মিশন গির্জা নামে পরিচিত হলেও, এর মূল নাম এপিফ্যানি উপাসনালয়। এটি প্রায় ১১৪ বছরের পুরনো একটি গির্জা, যা ১৯০৩ সালের ২৬ জানুয়ারি উদ্বোধন করা হয়। লাল ইটের এই চমৎকার গির্জাটি শত বছর পরেও ঝকঝকে ও সুদৃশ্য। এছাড়া এটি বেশ মজবুত একটি স্থাপনা।

গ্রিক স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত এই গির্জাটির নকশা করেছিলেন সিস্টার এডিথ এবং মূল আকৃতি দেন ফাদার স্ট্রং। গির্জাটিকে দূর থেকে দেখতে ৪-৫ তলা মনে হলেও ভেতরে গেলে দেখা যায় একতলা। কারণ এটি প্রায় ৫ তলা সমান উঁচু হলেও, মূলত একতলা।

গির্জাটির ছাদে কাঠের ব্যবহার করা হয়েছে এবং মেঝেতে সুদৃশ্য মার্বেল পাথরের টাইলস রয়েছে। এখানে অসংখ্য করিডর সহ ৪০টি খিলান রয়েছে। এর মূল প্রার্থনা কক্ষটির আয়তন প্রায় ৫০ ফুট, যার মূল বেদিতে একটি বিশাল আকৃতির ক্রুশ স্থাপিত হয়েছে। এই ক্রুশটি প্যালেস্টাইনের ব্যাথেলহাম থেকে আনা হয়। এছাড়াও গির্জাটিতে রয়েছে এশিয়া মহাদেশের সর্ববৃহৎ ঘণ্টা, যা দিনে সাতবার বেজে ওঠে।

অক্সফোর্ড মিশন গির্জাটি বরিশাল মূল শহরে মোট ৩৫ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত, যার চারপাশে ঘেরা রয়েছে উঁচু দেওয়াল দ্বারা। এখানে রয়েছে তেরটি ছোট-বড় পুকুর, অক্সফোর্ড মিশন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, পাঠাগার, ছাত্র-ছাত্রীদের হোস্টেল, ফাদার ও সিস্টারদের আবাসন ও হাসপাতাল।

মিয়াবাড়ি জামে মসজিদ

মিয়া বাড়ি জামে মসজিদ; Source: Archnet

বরিশাল জেলার অন্যতম প্রাচীন একটি মসজিদের নাম মিয়াবাড়ি জামে মসজিদ। এটি বরিশাল সদরের উত্তর কড়াপুর গ্রামে অবস্থিত। জানা যায়, মসজিদটি হায়াত মাহমুদ নামক একজন জমিদার নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর সম্পর্কে জনশ্রুতি আছে, তিনি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন। তাই জমিদারি কেড়ে নিয়ে তাঁকে প্রিন্স অফ ওয়েলস দ্বীপে নির্বাসিত করা হয়। সেখান থেকে তিনি দীর্ঘ ষোল বছর পর দেশে ফেরেন, এবং দুটি দীঘি সহ দোতলা এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদটির স্থাপত্যরীতিতে পুরান ঢাকায় অবস্থিত শায়েস্তা খান নির্মিত কারতলব খান মসজিদের অনুকরণ দৃশ্যমান।

মসজিদটি একটি উঁচু বেসমেন্টের উপর নির্মাণ করা হয়েছে। বেসমেন্টের অভ্যন্তরে দুটি কবর এবং অনেকগুলো কক্ষ রয়েছে। বর্তমানে কক্ষগুলো একটি মাদরাসার ছাত্রদের আবাসিক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। দুই তলায় মূল মসজিদটিতে প্রবেশ করার জন্য নিচে থেকে একটি প্রশস্ত সিঁড়ি রয়েছে। এছাড়া দৃষ্টিনন্দন কারুকার্য খচিত এই মসজিদটির সামনে ও পেছনে চারটি করে মোট আটটি মিনার এবং তিনটি গম্বুজ রয়েছে।

কসবা মসজিদ

কসবা মসজিদ; Source: Gournadi.News

ধর্মপ্রাণ মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষেরা মসজিদকে আল্লাহর ঘর বলে থাকেন, কিন্তু তাই বলে কোনো বিশেষ মসজিদকে আল্লাহর ঘর বলে কি? আমি এখন বলছি এমনই একটি মসজিদের নাম, যা আল্লাহর মসজিদ নামেই পরিচিত। এটি বরিশালের গৌরনদী উপজেলার কসবা নামক গ্রামে অবস্থিত একটি পুরাকীর্তি।

নয়টি গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদটি দেখতে খানিকটা খানজাহান আলী নির্মিত মসজিদগুলোর মতো বা বাগেরহাটের নয় গম্বুজ মসজিদেরই অনুরূপ বলা চলে।

মসজিদটির নির্মাণকাল বা নির্মাতার কোনো হদিস পাওয়া যায় না। তবে মসজিদটিকে ঘিরে রয়েছে নানা লোক কথা। জানা যায়, এক সময় কসবা গ্রামের এই মসজিদ এলাকাটি ঘন জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে সেই জঙ্গল পরিষ্কার করে আবাদ করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। তখন এক দল লোক নিয়ে সম্রাট জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করার সময় নয়টি গম্বুজ, পাঁচটি দরজা ও বহু মূল্যবান শ্বেত পাথর দ্বারা নির্মিত এই মসজিদটির সন্ধান পান। ঘন জঙ্গলে প্রাপ্ত এই মসজিদটির নির্মাণ ইতিহাস সম্পর্কে কোনো তথ্য না পেয়ে স্থানীরা এর নাম দেন “আল্লাহর মসজিদ”।

কসবা মসজিদের আগের রূপ; Source: kalerchobi.com

মসজিদটিকে ঘিরে আরো একটি অলৌকিক কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। বলা হয়, আজ থেকে প্রায় দেড়’শ বছর পূর্বে এক অন্ধকার রাতে মসজিদটির পূর্ব পাশের দীঘি থেকে অলৌকিকভাবে ঐশ্বরিক মনি-মুক্তা ও শ্বেত পাথরের আটটি খাম্বা উঠে আসে। সেখান থেকে চারটি খাম্বা ওই মসজিদের মধ্যে প্রবেশ করে তাঁর গম্বুজের সাথে মিশে যায়। আর অন্য চারটি খাম্বা উঠতে উঠতে সুবহে সাদিকের সময় হয়ে যায়। তখন একজন নববধূ এসে পড়ে এবং খাম্বা চারটি পানির নীচে তলিয়ে যায়।

এর পর থেকে মসজিদের খাম্বা থেকে আল্লাহর কুদরতি তেল নিঃসৃত হয়। ঐ তেলকে রহমতের তেল মনে করে সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষ ব্যবহার করে থাকে। অনেকে এই তেল ব্যবহার করে অনেক কঠিন রোগ থেকে মুক্তি পেয়েছে বলে জানা যায়।

কিছু কথা: উল্লিখিত স্থাপনা ছাড়াও, বরিশাল জেলায়আরো কিছু স্থাপনা রয়েছে। যেমন:-

১। বাংলার বারো ভুঁইয়াদের অন্যতম রাজা কন্দর্প নারায়ণের পুত্র রামচন্দ্র কর্তৃক পঞ্চদশ শতকের শেষের দিকে কিছু দেব-দেবীর মন্দির ও মঠ নির্মাণ করা হয়। এগুলোর তেমন কিছু এখন আর অবশিষ্ট না থাকলেও তার ধ্বংসাবশেষ এখনো কালের সাক্ষী হিসেবে টিকে আছে। এছাড়া তিনি এখানে কিছু সুদৃশ্য অট্টালিকা ও রাজবাড়ি নির্মাণ সহ কিছু দিঘী খনন করেছিলেন। দিঘীগুলো এখনো টিকে আছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় দিঘীটির নাম দুর্গা সাগর দিঘী।

দুর্গা সাগর; Source: Youtube

২। বাকেরগঞ্জে রয়েছে বারো আউলিয়ার দরগা। এখানে সেন আমলের একটি চার ফুট উঁচু স্তম্ভ রয়েছে।

৩। শোলক গ্রামে রয়েছে নবাবী আমলের অট্টালিকা, মঠ ও মন্দির।

৪। গৈলা-ফুলশ্রী গ্রামেও রয়েছে প্রাচীন মঠ ও মন্দির।

৫। নথুল্লাবাদে দক্ষিণ চক্র, বিরূপাক্ষ ও কালী মন্দির আছে।

৬। বাকেরগঞ্জের অদূরে একটি বিখ্যাত প্রাচীন মসজিদ রয়েছে, যার নাম শিয়ালগুনি মসজিদ।

Feature Image: dw.com

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
31
Booking.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *