স্মৃতিতে কক্সবাজারের প্রিয় জায়গা অ্যাঞ্জেল ড্রপ রেস্তোরাঁ

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry

অন্যদিনের মতোই ফেসবুক মেমোরিতে চোখ বুলাচ্ছিলাম। ফেসবুকের এ ফিচারটা আমার খুব পছন্দের, অন্য বছরগুলোতে এদিনের কী স্মৃতি ছিল সেটা দেখতে বেশ ভালো লাগে। চোখ আটকে গেলো একটা ছবিতে, ছবিতে উত্তাল সমুদ্র সৈকতে দুটো কাঠের রেস্তোরাঁ দেখা যাচ্ছে। আট বছর আগের তোলা এ ছবির রেস্তোরাঁগুলো আর নেই এখন, কিন্তু আমার মতো অনেকেরই স্মৃতিতে অমলিন থাকবে।

ছবিটা শেয়ার করলাম আমার টাইমলাইনে, প্রায় সাথে সাথেই বন্ধুদের কমেন্ট। কেউই ভোলেনি এর কথা। প্রায় সবারই একই কথা, সবারই অসম্ভব প্রিয় জায়গা ছিল এই রেস্তোরাঁ। ডিপার্টমেন্টের এক ছোট ভাই তানিম জানালো শুধু এখানে বসে থাকার জন্যই সে কক্সবাজারে ছুটে যেত প্রায়ই। আমি মোট কতবার কক্সবাজার গেছি সেটা গোনা সম্ভব নয়, তবে এখন আর এই জায়গায় বসতে পারি না।

মনে আছে প্রথমবার তাকে দেখার স্মৃতি। ২০০৪ সালের কথা, আমি সম্ভবত ৩য় বা চতুর্থবারের মতো কক্সবাজারে এসেছি। সঙ্গে আমার সব ছোটবেলার বন্ধু-বান্ধব। আমরা উঠেছি মেরিন ফিশারিজের গেস্ট হাউজে। এর আগে যে কয়েকবার এসেছি কলাতলী সৈকতে আসিনি। বিকেলে কলাতলী সমুদ্র সৈকতে এসে আবিস্কার করলাম অসম্ভব সুন্দর একটা রেস্তোরাঁ দেখা যাচ্ছে এখানে, যেটা আমরা আগে দেখিনি কখনো, এটাই “অ্যাঞ্জেল ড্রপ” রেস্তোরাঁ।

২০০৪ সালে বন্ধুদের সাথে তোলা হয় এ ছবিটি; সোর্স- বিপু

সব বন্ধুরা সেটাকে পেছনে রেখে ছবি তুলেছিলাম একটা। ডিজিটাল ক্যামেরা ছিল না আমাদের, এনালগ ক্যামেরাতে তোলা সে ছবিটাও খুঁজে পেয়েছি। অ্যাঞ্জেল ড্রপকে ফ্রেমে রাখার জন্য একটা নৌকার উপর উঠে বসতে হয়েছিলো। তবে খাবারের দাম কেমন হবে সেই ভয়ে সেবার কিন্তু এ রেস্তোরাঁয় ঢুকিনি আমরা। প্রথমবারের মতো এখানে ঢুকি ২০০৬ সালে। সেবার অনার্স ফাইনাল দিয়ে কয়েক বন্ধু মিলে গিয়েছিলাম কক্সবাজারে।

একরাতে ডিনার করার জন্য আমরা যাই ওখানে। বড় একটা কোরাল মাছের অর্ডার দিয়ে কাঠের চেয়ারগুলোয় বসেছিলাম আমরা। পুরো রেস্তোরাঁটাই পানির উপরে। কিন্তু যে পাশটা সমুদ্রের দিকে সেখানে বসতেই সবচেয়ে ভালো লাগছিল। অনেকগুলো কাঠের খুটির উপর দাঁড়িয়ে আছে রেস্তোরাঁটি। সৈকতের সাথে একটি কাঠের ব্রীজ দিয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে এটিকে। কাঁঠের খুটির উপরই কাঠের দোতলা রেস্তোরাঁ।

চমৎকার গঠন শৈলী ছিল এ রেস্তোরাঁর; ছবি- সার্ফ ক্লাব

দোতলাই বেশিরভাগ কপোত কপোতীদের বসে থাকতে দেখলাম। আর আমরা মূলে খোলা বারান্দায় এসে বসেছি। কাঠের খুঁটিতে আছড়ে পড়ছে সমুদ্রে ঢেউ, কখনো কখনো দুয়েক ফোটা পানিও এসে গায়ে পড়ছে আমাদের। টেবিলে একটি সুন্দর লন্ঠন জ্বেলে রেখে দেয়া আছে। চমৎকার ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের ঢংয়ে গড়া এই রেস্তোরাঁয় খুব সুন্দর একটা মিউজিকও বাজছিলো, একটু পরেই মিউজিক বন্ধ করে দেয়া হলো

কারণ একটা গানের দল এসেছে। তারা গান গাইবে এখানে, তাই মিউজিক বন্ধ করা হয়েছে। মিউজিক বন্ধ হলেও সমুদ্রের গর্জন কিন্তু থামেনি। সেটাকে ছাপিয়ে শুরু হলো গান। গিটারের সুর আর গানের তালে আমরা এতই মগ্ন ছিলাম ভুলেই গেছি এখানে আসার উদ্দেশ্য ছিল খাবার। সুস্বাদু ফিশ ফিংগারের সুগন্ধে পুরো জায়গাটা যখন মৌ মৌ করে উঠলে তখন আমাদের পেটও মোচড় দিয়ে জানিয়ে দিলো ডিনারের জন্যই এসেছি আমরা।

এখানে এসে বসলে সময় যে কীভাবে যেত টের পাওয়া যেত না; ছবি- শাহজাদা হাসান সাইদ

নিমেষেই শেষ হয়ে গেল ফিশ ফিংগারগুলো, এবার চলে আসলো বিশাল সাইজের কোরাল মাছ। ফ্রাইড রাইস, কোরাল মাছ দিয়ে আমাদের খাওয়া দাওয়া শুরু হলো। গান কিন্তু থামেনি তখনো, বরং চলছেই। খাওয়া শেষ করেও আমরা উঠতে পারছি না, এ অদ্ভূত সুন্দর পরিবেশের কারণে। কফির অর্ডার দিয়ে আবার বসে পড়লাম সবাই। একটু পরেই গরম কফিতে চুমুক দিয়ে গান আর সমুদ্রের গর্জনে বসে থাকতে থাকতে মনে হলো এখানেই কাটিয়ে দিতে পারি সারাটা জীবন।

খাবারও ছিল খুব সুস্বাদু; ছবি- রাসেল

মধ্যরাতে নিতান্ত অনিচ্ছায় বেঞ্চ ছেড়ে উঠলাম আমরা, ফিরে গেলাম আমাদের হোটেলে। আড্ডা-গান আর খানাপিনা চলে প্রায় পুরো রাতই। তাই সকালে নয় বরং প্রায় দুপুর হওয়ার পর খুলতো এই রেস্তোরাঁটি। এরপর থেকে আমি যতবারই কক্সবাজার গিয়েছি এখানে আসিনি এমন হয়নি। কোনোদিন হয়তো বিকেলে ফিশ ফিংগার খাওয়ার জন্য, কোনোদিন হয়তো ডিনারের জন্য।

২০১১ সালে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্তে গুঁড়িয়ে দেয়া হয় এ স্থাপনা। আসলে সমুদ্র সৈকতের উপরে এভাবে স্থাপনা তৈরী করা ছিল পরিবেশ আইন বিরুদ্ধ। এছাড়া আমাদের দেশের সমুদ্রতটের গঠনশৈলীর কারণে এ ধরণের স্থাপনা মোটেও নিরাপদ নয়। পাথুরে সৈকত হলে একটা বিষয় ছিল, কিন্তু বালিতে খুঁটি দিয়ে এ ধরনের স্থাপনা যে কোনো দিন বড় ধরনের বিপদ ঘটানোর আশংকা ছিল।

কলাতলী সৈকতের বর্তমান এই ছবি তোলা হয়েছে সায়মন হোটেলের কক্ষ থেকে; ছবি- লেখক

এছাড়া এটা দেখে পাশাপাশি আরও একটা রেস্তোরাঁ হয়েছিল, একেবারেই অ্যাঞ্জেল ড্রপের গা ঘেঁষে, সেটার নাম ছিল সম্ভবত ট্রপিকানা। এরপরে আরও কয়েকটা গড়ে উঠতে শুরু করেছিলো, বাধ্য হয়ে প্রশাসন সবগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। গুঁড়িয়ে দেয়া হয় সব কয়টি রেস্তোরাঁ। শুনেছি রেস্তোরাঁর মালিক এটা ভেঙে দেবার পর বাংলাদেশ ছেড়ে অস্ট্রেলিয়ায় চলে যান।

আইনের প্রতি আমার শ্রদ্ধা রয়েছে, বুঝতে পারি বৃহত্তর কল্যাণের জন্যই প্রশাসনকে এ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। কিন্তু নিজের মনকে কখনো বোঝাতে পারি না। এখনও কক্সবাজারে গেলে আনমনে খুজে বেড়াই প্রিয় এ রেস্তোরাঁটিকে। ফেসবুক মেমোরিতে দেখানো ছবিটা আমি তুলেছিলাম হোটেল সি ক্রাউনের বারান্দা থেকে।

হোটেল সি ক্রাউনের বারান্দা থেকে তোলা শেষ স্মৃতিচিহ্ন; ছবি- লেখক

এখনও আমার মনে আছে সেদিনের কথা। সমুদ্র খুব উত্তাল ছিল সেদিন, তিন নাম্বার সিগন্যাল চলছিলো। আমি হোটেল সি ক্রাউনে আমার রুমের বারান্দায় এসে নিচে তাকিয়ে উত্তাল সমুদ্রের মধ্যে ছোট্ট দুটো রেস্তোরাঁকে দেখে মুগ্ধ হয়ে যাই। রুমে ফিরে গিয়ে ডিজিটাল ক্যামেরা নিয়ে এসে কয়েকটি ছবি তুলি। যার একটি আপলোড করাতে প্রিয় এ জায়গাটির শেষ স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রয়ে গেছে এ ছবি।

এর আগে পরে অনেকবার যাওয়া হয়েছে এ রেস্তোরাঁয়। আসলে কক্সবাজারে গেলে এখানে যাইনি এ ঘটনা খুব কম ঘটেছে। স্মৃতি হাতড়ে বের করলাম পুরনো বেশ কিছু ছবি। বেশির ভাগই ২০০৪ থেকে ২০১১ এর মধ্যে তোলা। পাঠক, প্রিয় এ জায়গাটি স্মরণ করতেই আজকের এ লেখা। আপনার যদি এ জায়গায় কোনো স্মৃতি থাকে শেয়ার করুন আমাদের সাথে।

ফিচার ছবি: সাইফুল ইসলাম

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
Booking.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *