যোগী হাফং জয়ের গল্প

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry

জোতলাং আর যোগী হাফং পাহাড় প্রেমীদের কাছে পরিচিত দুটি নাম। বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তে দুর্গম অঞ্চলে এই দুই পাহাড়ের অবস্থান। বাংলাদেশের মোদক তং রেঞ্জের পাহাড়গুলোর উচ্চতা সব থেকে বেশি। বেসরকারিভাবে বাংলাদেশের ২য় এবং ৪র্থ চূড়া যথাক্রমে জোতলাং এবং যোগী হাফং। বাংলাদেশ থেকে মায়ানমারকে পৃথক করতে দাঁড়িয়ে আছে স্বমহিমায়।

জোতলাংয়ের চূড়া; ছবি- সাইমুন ইসলাম

এই দুই চূড়া জয়ের ভূত চাপে ২০১৭ সালে। পরিকল্পনা মাফিক এগিয়ে গেলEও সে বার আমার দুই চূড়া জয়ের গল্প অধরাই থেকে যায়। জোতলাং জয় করতে পারলেও যোগী হাফংয়ে যাওয়া হয় না। মাঝখানে বাঁধা হয়ে থাকে রবিবার। ঐদিন প্রেয়ার ডে থাকায় কোনো গাইড পাওয়া যায়নি। তাই যোগী হাফং জয় অধরাই রয়ে যায়।

সর্পিল রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছি; ছবি- রাসেল আহমেদ জয়

২০১৭ সালে চাপা ভূত ছাড়াতে ২০১৮ তে আবার যাই। এবার একদম আটঘাট বেঁধে যাই। কোনোভাবে মিস হওয়ার সুযোগ নেই। গতবারের থেকে এবারের টিমও ছোট। মাত্র ১০ জন। সায়েদাবাদ থেকে বাসে করে বান্দরবানের দিকে যাত্রা আরম্ভ করি। কাক ডাকা ভোরে গিয়ে বান্দরবানে পৌঁছাই। হালকা নাস্তা সেরে মুড়ির টিনের মতো লোকাল বাসে করে থানচির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু। বাসের ছাদে টুপটুপ করে কুয়াশা পড়ছে। সর্পিল রাস্তা ধরে পাহাড়ের গায়ে চক্কর কেটে এগিয়ে চলেছি।

সবুজ পাহাড়গুলো আড়াল করে রেখেছে সফেদ সাদা মেঘের চাদর। কখনো কখনো পেঁজা পেঁজা মেঘ রাস্তায় উঠে আসছে। হিম হিম হাওয়ার মধ্যে দিয়ে পৌঁছে যাই থানচিতে। পুলিশ বিজিবির অনুমতি নিয়ে আগে থেকে ঠিক করে রাখা ট্রলারে চেপে বসি। এবারে আমাদের সাথে গাইড হিসেবে আছেন বাহাদুর।

বর্ষাকালে খরস্রোতা সাঙ্গু নদী ভয়ানক রূপে দেখা দিলেও শীতের শেষের দিকে বেশ শান্ত থাকে এই নদী। স্বচ্ছ নিটোল পানির ধারা বয়ে চলেছে অবিরত। নদীর দু’পাশে পাহাড়ে ঘেরা অসংখ্য ছোট বড় পাথরের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলেছে সাঙ্গু নদী। তিন্দু পার হতেই দেখা মিলবে রাজা পাথর-বড় পাথরের। দুপুর ২টা নাগাদ পৌঁছে যাই রেমাক্রিতে।

তিন্দু পার হয়ে; ছবি- রাসেল আহমেদ জয়

মূলত রেমাক্রি থেকে আমাদের ট্রেকিং শুরু হয়। রেমাক্রি পাড়া থেকে ৬০০ টাকা চুক্তিতে আরেকজন লোকাল গাইড সাথে নিতে হয়। ঝিরি, জঙ্গল, পাহাড়ি খাড়াই উৎরাই পার করতে করতে সন্ধ্যা নাগাদ পৌঁছে যাই দলিয়ান পাড়ায়।

এই পাড়ায় এর আগেও আমি একবার এসেছি। অত্যন্ত সাজানো গোছানো দলিয়ান পাড়া। পাড়ায় আমাদের জন্য বরাদ্দকৃত ঘরে উঠে ফ্রেশ হয়ে নেই। রাতে খাবারের সময় পাড়ার কারবারির সাথে কথা বলে পরের দিন যোগী হাফং যাওয়ার জন্য লোকাল গাইডের ব্যবস্থা করে রাখতে বলি। সারাদিনের ক্লান্ত পরিশ্রান্ত শরীর নিয়ে বিছানায় যেতেই ঘুমিয়ে পড়ি।

দলিয়ান পাড়া; ছবি- রাসেল আহমেদ জয়

সবাই ২য় সর্বোচ্চ পাহাড় জোতলাং দিয়ে ট্রেকিং শুরু করলেও আমরা যোগী হাফং দিয়ে শুরু করি। ঐদিন পাড়ায় ট্যুরিস্টের সংখ্যা বেশি থাকায় মূলত এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তাছাড়া জোতলাংয়ের তুলনায় যোগী হাফং বেশ কঠিন ট্রেইল। এর মূল কারণ এই ট্রেইলে পানির উৎসের অভাব প্রকট। আর কিছু সাথে নিন আর নাই বা নিন পানি নিতে হবে বেশি করে।

পাথুরে দেয়াল বেয়ে এগিয়ে চলা; ছবি- তানভীর আহমেদ

সকাল ৬টার মধ্যে দলিয়ান পাড়া থেকে ট্রেকিং শুরু করি। ১০ জনের মধ্যে ৯ জন যোগীর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ি। রাসেল ভাই এর আগে যোগীতে গিয়েছিল দেখে আজ আর যাচ্ছে না। এভাবে কিছুক্ষণ হাঁটার পর লৌহ ঝিরিতে গিয়ে পৌঁছে যাই। জায়গাটা ‘ওয়াই” জংশনের মতো। রাস্তা দুই ভাগ হয়ে দুই দিকে চলে যাওয়ায় নাম দিয়েছে ‘ওয়াই’ জংশন।

হাতের ডানে গিয়েছে জোতলাং আর বামে ৪র্থ চূড়া যোগী হাফং। আমরা হাতের বাম দিক বরাবর এগিয়ে যেতে থাকি। বড় বড় বোল্ডার ডিঙিয়ে যেতে হচ্ছে। কখনো বা গাছের শেকড় ধরে ঝুলে উপরের দিকে উঠতে হচ্ছে। জনমানবহীন পাহাড়ি জঙ্গলে ঘেরা পথের নীরবতা ভেঙে এগিয়ে যাচ্ছি।

বাঁশের ঝাড়ের ছড়াছড়ি; ছবি- তানভীর আহমেদ

কিছুক্ষণ পর নিজেদেরকে আবিষ্কার করলাম এক পাহাড়ের পাদদেশে। গাইড দাদা বললেন এটাই নাকি যোগীর পাদদেশ। পাহাড়ের উপরের দিকে নজর যেতেই বাঁশ গাছ আর বাঁশ গাছ ছাড়া কিছুই চোখে পড়ল না। অন্যদিকে, এই খাঁড়া পাহাড় বেয়ে উপরের দিকে উঠতে হবে চিন্তা করতেই কলিজার পানি শুকিয়ে গেছে। বেশ কিছুক্ষণ জিরিয়ে হালকা খাবার দাবার খেয়ে নেই।

নিজের মনকে সাহস দিয়ে আবার চলা শুরু করি। উপরের দিকে উঠছি তো উঠছি। পথ যেন আর শেষ হয় না। বিশেষ করে বাঁশ বাগান আর শেষ হতে চাইছে না। গাইড দাদাকে যতবার বলি আর কত দূর, দাদা বলে এই তো সামনে। সামনে আর শেষ হতে চায় না। তাই ক্লান্ত শরীর নিয়ে ধীরে ধীরে এগোতে থাকি।

যোগীর চূড়ায়; ছবি- রাম জয় দেব নাথ

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত যে সকল পাহাড়ে অভিযান হয়েছে সেগুলোর মধ্যে ভয়ংকর এবং বিপদজনক হচ্ছে যোগী হাফং বা কুংদক। এর উচ্চতা ৩,২৪৪ ফুট। যোগী হাফংয়ের মূলত চারটি চূড়া। সর্বোচ্চ চূড়া একটি, বাকি তিনটি সাব চূড়া। চার নাম্বার চূড়াটি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। এর কারণ হচ্ছে তিন নাম্বার চূড়া থেকে চার নাম্বার যেতে হলে রিজ লাইন ধরে যেতে হয়। আর এই কারণে অনেকেরই এই অভিযান অসমাপ্ত থেকে যায়।

রিজ লাইন ধরে চূড়ার দিকে; ছবি- তানভীর আহমেদ

প্রাকৃতিক অপরূপ দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা ততক্ষণে পৌঁছে গেছি তিন নাম্বার চূড়ার কাছাকাছি। রিজ লাইন দেখে গলাটা একটু শুকিয়ে গেল। রিজ লাইন পার হতে গিয়ে যদি কোনোভাবে ডান দিকে গড়িয়ে পড়ি তাহলে নিশ্চিত মায়ানমারের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবো। আর যদি বাম দিকে পড়ি তাহলে বাংলাদেশের গাছগুলোর সাথে আটকে থাকবো। এই সব চিন্তা ভাবনা করে রিজ লাইন ধরে এগিয়ে গেলাম। লক্ষ্যে অবিচল থেকে যোগীর মেইন চূড়ায় পৌঁছে গেলাম। দুপুর ১টার দিকে বাকিরা সফলভাবে এই চূড়া আরোহণ করতে পেরে খুশীতে আত্মহারা হয়ে পড়ে।

সামিট নোট।

সামিট নোট লিখে গ্রুপ ছবি তুলে এবারে ফেরার পালা। জয়ের আনন্দ সাথে নিয়ে দিনের আলো থাকতে থাকতে পাড়ায় ফিরতে হবে। কারণ অন্ধকারে পাহাড়ি রাস্তা খুব ভয়ানক জিনিস।

পাথুরে দেয়াল; ছবি- তানভীর আহমেদ

যেভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে বান্দরবান

ঢাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে হানিফ, ইউনিক, শ্যামলি ইত্যাদি পরিবহনের বাস বান্দরবানে যায়। ভাড়া জনপ্রতি নন-এসি ৬২০ টাকা।

বান্দরবন থেকে থানচি

সকালে বান্দরবান শহর থেকে লোকাল বাস থানচি যায়। লোকাল বাস/ জীপ রিজার্ভ নিয়ে যেতে পারেন। জীপ ভাড়া ৬,০০০ থেকে ৬,৫০০টাকা।

থাকা-খাওয়া ও গাইড

গাইডের নাম হারুনুর রশিদ হারুন। উনার মাধ্যমে আমরা অন্য গাইডের ব্যবস্থা করেছিলাম। গাইডের নাম্বার- ০১৮৪৯৫৫৬৩৪০। আগে থেকে গাইডের সাথে কথা বলে রাখা ভালো।

অবশ্যই মনে রাখবেন:

*যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা থেকে দূরে থাকবেন।
*খেয়াল রাখবেন আপনার অতি উচ্ছ্বাসে প্রকৃতির যেন কোনো ক্ষতি না হয়।
*সঙ্গে নেওয়া পলি প্যাকেটগুলো সঙ্গে নিয়ে ফিরুন।

*** ফিচার ইমেজ- তানভীর আহমেদ

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
Booking.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *