ভাটিয়ারি জাহাজ ইয়ার্ড ও লেকের ঝটিকা সফর

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry

চট্টগ্রামের হোটেল থেকে বেরোতেই বেশ বেলা হয়ে গিয়েছে। গতকালের সারাদিনের ধকল সামলাতেই আজ বেলা বারোটা বেজে গিয়েছে। তাড়াহুড়ো করে কিছু খেয়ে নিয়ে বাসে চাপলাম ভাটিয়ারির দিকে। সমুদ্রের পাড়ে একটু বাতাস খাওয়ার পাশাপাশি বিশাল সব জাহাজের কারখানা দেখার ইচ্ছেতেই যাচ্ছিলাম ভাটিয়ারি ইয়ার্ডের দিকে। শুনেছিলাম এখানে নাকি এ্যাভেঞ্জার মুভির শুটিংও হয়েছিল।

যখন ভাটিয়ারি বাজারে এসে নামলাম, সূর্য তখন মাথার উপরে, যেন দাও দাও করে জ্বলছে। ইয়ার্ডে যাবার মতো কোনো রিকশা পেলাম না। অগত্যা দলের ৬ জন মিলে হাঁটা শুরু করলাম। গুগল ম্যাপ দেখে এগোচ্ছি আর বার বার পথ ভুল হচ্ছে। গলির মাথা শেষ হয়ে যাচ্ছে সামনে আর কানাগলিগুলোর জন্য বিরক্ত লাগা শুরু হলো। অবশেষে স্থানীয়দের কাছে শুনে শুনে ও ৭ বছর বয়সী একটা ছেলের সাহায্য নিয়ে আমরা ইয়ার্ডের পাশে খোলা একটা জায়গায় ঢুকলাম। 

বিশাল জাহাজ গুলো এখানেই ভেঙ্গে মেরামত করা হয়। ছবিঃ লেখক

ইয়ার্ডে বহিরাগতদের প্রবেশ নিষেধ ছিল। তাই কাছে থেকে বিশাল জাহাজগুলো কীভাবে ভাঙে আর কীভাবে সেগুলো থেকে নতুন জাহাজ বানায় সেটা দেখার মতো অবস্থা ছিল না আমার। একটা ঘরের মতো জায়গায় পৌঁছালাম। বিশাল মোটা মোটা স্টিলের দড়ি রাখা। জাহাজগুলোকে সমুদ্রের পাড়ে নোঙর করে রাখার জন্যই এই কাছিগুলো ব্যবহার করা হয়। 

তবে দীর্ঘদিন ব্যবহার না করার ফলে এগুলো মরিচা পড়ে গিয়েছে। আমাদের সামনে বিশাল খোলা সমুদ্রের আগে রয়েছে ঘাস কাদার বিশাল আরেকটি মাঠ। যেটা পার হয়ে যাওয়া রীতিমতো অসম্ভব মনে হচ্ছিল। মাঠ ভরা হাঁটু সমান কাদা আর ধারালো ঘাসে ভরা।

সামনের খটখটে প্রান্তর পেরোলেই চোখে পড়ে হাটু কাদার বিশাল প্রান্তর। ছবিঃ লেখক

কিছুক্ষণ সারেং ঘরে বসে থেকে প্রচণ্ড দাবদাহ থেকে নিজেদের বাঁচালাম। এরপর আমি ও কামরুন নাহার ইতি দুই জনে সমুদ্রের দিকে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। বাকিদের কেউই এই পরিমাণ কাদা পার হয়ে সমুদ্রের পাড়ে যাবার সাহস দেখায়নি।। যদিও তারাই যে ভালো করেছে সেটা পরে বুঝতে পেরেছিলাম।  

যত সামনের দিকে যাচ্ছি, কাদার পরিমাণ বাড়ছে। কিছু কিছু জায়গায় হাঁটু ছাড়িয়ে কাদা আরো উপরে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে বেশ ভয় পেয়ে যাচ্ছিলাম। কিছু কিছু জায়গায় আমি ইতিকে আর ইতি আমাকে হাত ধরে টেনে তুলতে হয়েছে। হাঁটতে হাঁটতে বুঝলাম এই ঘেসো কাদার প্রান্তর যতটা দূর ভেবেছিলাম আসলে তার থেকে দুই গুণ দূরে। গভীর কাদা আর রোদের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে হাল ছেড়ে দিলাম দুজনেই। ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। দূরের বিশাল আকারের জাহাজটা আর দেখা হলো না।

ভাটিয়ারী লেকের স্বচ্ছ কাকচক্ষু জল। ছবিঃ লেখক

ফিরে আসতে সময় কম লাগল। এসে ভালো পানি খুঁজে পাওয়াই কষ্টকর হয়ে দাঁড়াল। আমাদের হাঁটুর উপর অব্দি কাদা শুকিয়ে গিয়েছে। কোনোমতে একটা পুকুর খুঁজে কাদা ধুয়ে বাকি দলের সাথে যোগ দিলাম। দেখলাম বাকিরা আমাদের জন্য কোল্ড ড্রিংক্স, ম্যাংগো জুস নিয়ে বসে আছে। 

ইয়ার্ড থেকে বের হয়ে আবার হেঁটে চলে আসলাম ভাটিয়ারি বাজারে। এর পরের টার্গেট ছিল সানসেট পয়েন্ট হয়ে ভাটিয়ারি লেক। একটা নসিমনের মধ্যে ঢুকে বসে পড়লাম। বেশিক্ষণ দাঁড়াল না। আমাদের নিয়ে চলতে শুরু করল। দুই পাশে পাহাড়ের সাথে রাস্তাও উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে আর চারদিকের দৃশ্য চোখের সামনে ভাসছে। পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে নিচের দিকে লেকের পানি টলটল করছে। কালো টলটলে পানি দেখে বেশ ভয় হচ্ছিলো। শুনেছি পাহাড়ি লেকগুলো অনেক গভীর হয়। আমাদের বাহন আমাদের ভাটিয়ারি গলফ ক্লাবের গেটে নামিয়ে দিলো। সেখান থেকে একটু নিচে হেঁটে গিয়েই দেখলাম স্বচ্ছ ঝলমলে জলে ভেসে চলেছে নৌকাগুলো। 

প্রচণ্ড উজ্জ্বল আলো যেন স্বচ্ছ জ্বলে পড়ে ঝিলমিলিয়ে উঠছে। ছবিঃ লেখক

কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে বিশ্রাম সেরে নিলাম। নৌকায় উঠে পাহাড়ি টিলাগুলোর ফাঁকে ফাঁকে বিধৌত এই লেকের স্বচ্ছ জলে নেমে যেতে ইচ্ছে করছিলো খুব। এরপর একটা নৌকা ঠিক করা হলো। সেখানেই আমরা ৬ জন উঠে পুরো লেকটা ঘুরব। সব মিলিয়ে ৩০ মিনিটের মতো লাগার কথা ছিল। কিছুক্ষণ দাম দর ঠিক করে একটা বড় বোটে উঠে পড়লাম ছয় জন। লেকে দুপুরের স্বচ্ছ জ্বলে সুর্যের প্রখর আলো যেন ম্লান হয়ে পড়ছিল প্রতিটা মুহূর্তে। ছোট ছোট পাহাড়ি টিলার মধ্যে দিয়ে লেকের কালো জল ধরে এগিয়ে যেতে থাকলাম ভাটিয়ারী লেক ধরে।

ফেরার পথের জলকেলি। ছবিঃ লেখক

আলো ছায়ার খেলা চলছে পাহাড়ের গায়ে। লেকের জল এই প্রচণ্ড গরমের মধ্যে যেন হিম শীতল রূপ ধারণ করে আছে। বেশ কিছু বিশাল সাইজের গুইসাপ চোখে পড়ল আমাদের। সাইমুন মামা সেগুলোর ছবি তুলছিল। আধা ঘণ্টা ধরে আমাদের ইঞ্জিন চালিত বোটটিতে সারা লেক ধরে ঘুরে বেড়ানোর পর আমাদের জন্য নির্ধারিত সময় ফুরিয়ে আসলো। আমরা আবার ঘাটের দিকে এগুতে শুরু করলাম। সারা দিনের জ্যাম, রৌদ্র আর কাদা মাখামাখির পর একটু স্নিগ্ধ সময় ছিল এই ভাটিয়ারী লেকের বিকেলটুকু।

রুট ও খরচের খসড়া:

ঢাকা থেকে যে কোনো বাসে বা ট্রেনে করে চলে আসতে হবে চট্টগ্রাম। ভাড়া পড়বে বাসে ৪৫০-৫০০ টাকা ও ট্রেনে ১২০-৫০০ টাকার মতো। চট্টগ্রাম থেকে সি এন জি বা বা পুরনো ট্রেন স্টেশনের পাশেই বাস স্ট্যান্ড থেকে মিনিবাসে করে চলে আসতে হবে ভাটিয়ারি বাজারে। এখান থেকেই রিকশা করে প্রথমে ইয়ার্ড ঘুরে আসা যাবে। ভাড়া নেবে ২০-৩০ টাকা।

ইয়ার্ড থেকে আবার ভাটিয়ারি বাজারে ফিরে সি এন জি বা হিউম্যান হলারে করে চলে আসা যাবে ভাটিয়ারি লেকের সামনে। জন প্রতি ভাড়া পড়বে ১৫-২০ টাকা। চট্টগ্রামে এসে খাবার ব্যবস্থা করলে ভালো হয়, নাহলে ভাটিয়ারি বাজার থেকেই খেয়ে নেয়া যাবে দুপুরের খাবার।

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
Booking.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *