ফেনীর শুভপুরে শমসের গাজীর বাঁশের কেল্লা রিসোর্টে পদচারণ

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry

আমরা মূলত কিছুক্ষণ সময় পার করার জন্য ছাগলনাইয়ার কাছাকাছি একটা জায়গা খুঁজছিলাম। শমসের গাজীর দীঘি যাবো বলে ঠিক করলাম। সরাসরি দীঘির কাছে তো কেউ নিয়ে যাবে না, জায়গার নাম লাগবে। জায়গার নাম খুঁজতে গিয়ে দেখি অনেকগুলো নাম। চম্পকনগর, শুভপুর, জগন্নাথ সোনাপুর। একটা জায়গার এত নাম কী করে হয়, তাই ভেবে বিভ্রান্ত হচ্ছিলাম। সিএনজিওয়ালাকে তাই তিনটি নামই বলেছিলাম। তিনি আমাদের নামিয়ে দিলেন চম্পকনগর।

চম্পকনগর থেকে হাঁটতে হাঁটতে শমসের গাজীর দীঘি দেখলাম, গুহা দেখলাম, ভারতের সীমানা দেখলাম। প্রথমে ভেবেছিলাম দীঘির পাশেই থাকার জন্য সাধারণ কোনো কটেজ তৈরি করে ওটার নাম দিয়েছে শমসের গাজীর রিসোর্ট। কারণ, চারশ বছর আগে তো আর শমসের গাজী কোনো রিসোর্ট বানিয়ে যাননি। যদিও বা কিছু একটা বানাতেনই, ওটা হতো জমিদার বাড়ি ধরনের কিছু। তা তো নয়। ওটা নাকি একটা বাঁশের কেল্লা। দীঘির পাশে বাঁশের কেল্লা বা কোনো স্থাপনাই দেখতে পাইনি। জানতে পারলাম, বাঁশের কেল্লায় যেতে হলে আরো সামনে যেতে হবে।

রিসোর্টের সামনে লাল রঙের প্রবেশদ্বার; source: মাদিহা মৌ

অগত্যা আবারো হাঁটতে শুরু করলাম। লোকজনকে জিজ্ঞেস করি, হাত তুলে আরো সামনে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। হাঁটছি তো হাঁটছিই। নিলয় বার বার বলছে, ‘আসলেই কি বাঁশের কেল্লা-টেল্লা আছে? নাকি বেগার খাটছি?’

আমি বললাম, ‘যাই থাকুক, খুব বেশি প্রত্যাশা করিস না। ধরে নে, বাঁশ দিয়ে বানানো ভাঙাচোরা কিছু একটা হবে। আসলে আমাকে নামটাই খুব টানছে। তিতুমীরের বাঁশের কেল্লার মতো কিছু কি না, দেখতে চাই।’

অবশেষে আমাদের গন্তব্য এলো। এবং বাঁশের কেল্লাটি আমাদের ভালোমতোই চমকে দিলো। বাঁশের কেল্লার বর্ণনা দেওয়ার আগে এর নামের নৈপথ্যের কারণ জানাই। বাংলার ভাটির বাঘ নামে পরিচিত ছিল শহীদ বীর শমসের গাজী। প্রায় চারশ’ বছর আগে বর্তমানে ফেনী জেলায় পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলা এবং ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের একাংশের তৎকালীন শাসক ছিলেন। বৃটিশ বেনিয়াদের অন্যতম দমনকারী ছিলেন এই শমসের গাজী। দক্ষিণেশ্বরের জমিদার ও ত্রিপুরার এই নবাব শমসের গাজীর স্মৃতি রক্ষার্থে রিসোর্টটির নামকরণ করা হয়েছে।

মঞ্চের উপর সাজানো গিটার, একতারা আর তবলার ভাস্কর; source: মাদিহা মৌ

রিসোর্টের সামনে লাল রঙের প্রবেশদ্বার। এখানে টিকিট কাটার জন্য কোনো লোক নেই, তবে মানুষজন দেখলে ভেতর থেকে লোক এসে টিকিট দিয়ে যায়। ২০ টাকা মূল্যের এই টিকিটটি শুধুমাত্র কেল্লার বহিরাঙ্গন পরিদর্শনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। রিসোর্টে অবস্থানকালে টিকিটটি সাথে রাখতে হয়।

ইনি খুব ভাবে আছেন; source: মাদিহা মৌ

টিকিট কেটে ঢুকলেই প্রথমে চোখে পড়বে, একটি মঞ্চের উপর সাজানো গিটার, একতারা আর তবলার ভাস্কর্য। এর নাম ঐকতান ভাস্কর্য। এর ডান পাশে রিসোর্টের দিকে যাওয়ার ঢালাই করা পথ। পথটি গিয়ে মিশেছে বাঁশের কেল্লার মূল প্রবেশদ্বারে। রিসোর্টটির মূল উপকরণ বাঁশ হলেও এটি কেবল বাঁশ দিয়ে নির্মাণ করা হয়নি। পাকা মেঝে টাইলস করা। দেয়ালেও ইট সিমেন্টের ব্যবহার আছে।

জানালাগুলো থাই গ্লাসের, আর দরজা পুরোটাই কাঁচের। তাই বাইরে থেকে রিসোর্টের অভ্যন্তরীণ সজ্জা দেখা যাচ্ছিলো। তবে কেল্লায় বাঁশের ব্যবহার বেশ দৃষ্টি নন্দন। রিসোর্টের সামনে কাঠমালতি ফুলের ঝোপ। সফেদ কাঠমালতি ফুটে রয়েছে। রিসোর্টের সামনেই খোলা জায়গায় গাছ লাগানো। তারই একধারে বাঁশের মাচার উপর ছোট একটা ঘর আছে। এটার কাজ কী, জানতে পারিনি।

ভাস্কর্য; source: মাদিহা মৌ

রিসোর্টের পেছনে একটি জলাশয় আছে। জলাশয়ে নৌভ্রমণ করার জন্য বোট ভাড়া দেওয়া হয়। ২০ মিনিট সময়ে ৪ জন নৌকা ভ্রমণ করতে পারে ১০০ টাকা খরচ করে। পুকুর পাড়ে দুটো বানর চেইন দিয়ে বাঁধা। এই জলাশয়টির উপরেই কাঠের সেতু পেরিয়ে ওপাশে দেখি একটা ত্যাঁদড় খরগোশ চুপচাপ বসে আছে। ছবি তুলতে গেলাম, কয়েক লাফে পালিয়ে গেলো। এখানটায় দুটো ঘর আছে যেগুলো পুরোটা এক ধরনের লতানো গাছে ছাওয়া। লতানো ঘরের প্রবেশ পথে দাঁড়িয়ে চমৎকার ছবি তোলা যায়।

রিসোর্টে থাকার জন্য ৮টি রুম আছে। রুমের ভাড়া ৩,৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ৭,৫০০ টাকার মধ্যে। যদিও এত টাকা খরচ করে এখানে রাত্রিযাপন করার জন্য কোনো ইচ্ছেই জাগেনি আমার।

বাঁশের কেল্লা রিসোর্ট; source: মাদিহা মৌ

আমরা কোনোরকম আশা নিয়ে এখানে আসিনি। এরকম একটা রিসোর্ট এখানে আছে আমাদের কল্পনাতেও ছিল না। এখানে এসে এটা আবিষ্কার করে খুবই তৃপ্তি পেয়েছি। ঘুরেও মজা লেগেছে। জায়গাটায় নিলয়ের বুদ্ধিতে আসা, তাই এটার পুরো কৃতিত্বই তার।

দরজা পুরোটাই কাঁচের; source: মাদিহা মৌ

কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে ট্রেনে ও বাসে ফেনী যাওয়া যায়। ট্রেনে যেতে চাইলে চট্টগ্রামগামী রাতের শেষ ট্রেন তূর্ণা নিশিথায় যেতে পারেন। রাত সাড়ে ১১টায় কমলাপুর থেকে ছেড়ে যাওয়া তূর্ণা নিশিথায় ফেনী পৌঁছে যাবেন সাড়ে চারটায়। ভাড়া ২৬৫ টাকা।

আবার কম খরচে চট্টগ্রাম মেইলে যেতে পারেন। ভাড়া পড়বে মাত্র ৯০ টাকা। চট্টগ্রাম মেইল কমলাপুর থেকে ছাড়ে রাত সাড়ে দশটায়। সাত ঘণ্টা লাগবে ফেনী পৌঁছাতে। বাসে যেতে চাইলে, এনা ট্রান্সপোর্টে ও স্টার লাইনে যেতে পারেন। ভাড়া ২৭০ টাকা।

ত্যাঁদড় খরগোশ; source: মাদিহা মৌ

ফেনী স্টেশন রোড থেকে ছাগলনাইয়ার সিএনজি পাওয়া যায়। ভাড়া ২৫ টাকা প্রতিজন। ছাগলনাইয়া থেকে শুভপুরের সিএনজি পাবেন। ভাড়া ২০ টাকা। শুভপুর বাজার থেকে সিএনজি বদলাতে হবে জগন্নাথ সোনাপুর যাওয়ার জন্য। ১০ টাকা করে ভাড়া পড়বে। জগন্নাথ সোনাপুরেই শমসের গাজীর বাঁশের কেল্লা রিসোর্ট। ২০ টাকা মূল্যের টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকতে হয়।

source: মাদিহা মৌ

শমসের গাজীর বাঁশের কেল্লা রিসোর্টের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন 01767863558 অথবা ০১৫৫২৯২৬০০৯ এই নাম্বার দুটোতে।

Feature Image – মাদিহা মৌ

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
Booking.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *