প্রাচীনত্বের মোহে বালিয়াটি জমিদার বাড়িতে

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry

শীতের হিমহিম ভোরে আমাদের যাত্রা শুরু হয় মানিকগঞ্জের উদ্দেশ্যে। পথে ভ্রমণসঙ্গীদের সঙ্গে নিতে নিতে ঢাকা ছাড়তে বেজে যায় ৯টা। শুক্রবার হলেও এতে কিছুটা জ্যামে পড়তে হয় সবাইকে। তবে তা শুধুমাত্র ঢাকার সড়কেই। শহর ছেড়ে গ্রামের দেখা মিলতেই যেমন হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছিলো জ্যাম, তেমনি শহুরে যান্ত্রিকতাও।

আমাদের এবারের গন্তব্য মানিকগঞ্জের বালিয়াটি জমিদার বাড়ি ও অন্যান্য কয়েকটি স্থান। তবে তালিকায় শীর্ষে ছিল বালিয়াটি জমিদার বাড়িটিই। তাই ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করে আমরা প্রথমে বালিয়াটির পথেই আগালাম।

বালিয়াটি গ্রামের একটি অংশ; সোর্স: লেখিকা

ঢাকা জেলা সদর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে সাটুরিয়া উপজেলার বালিয়াটি গ্রামে অবস্থিত বালিয়াটি জমিদার বাড়িটি। ঢাকা থেকে মানিকগঞ্জ সদরে পৌঁছাতে মোটামুটি দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা লাগে। তবে মানিকগঞ্জ পৌঁছেই ধৈর্য হারালে চলবে না, বালিয়াটি জমিদার বাড়ি পৌঁছাতে আপনাকে যেতে হবে গ্রামের সরু পথ ধরে আরো অনেকটা ভেতরে।

কখন জমিদার বাড়িতে পৌঁছাবো তা নিয়ে ভেতরে একপ্রকার তাড়া থাকলেও এই পথ চলতে মন্দ লাগলো না। গ্রামের আঁকাবাঁকা পথ, চারপাশে বিশালাকার ধানক্ষেত, সবজি ক্ষেত, সরষে ক্ষেত, দূর-দূরান্ত জুড়ে সবুজের সমারোহ, মাঠের শেষটায় মিশে থাকা নীল আকাশ সব মিলিয়ে এ দৃশ্য কার না ভালো লাগবে!

বালিয়াটি জমিদার বাড়ির একাংশ; সোর্স: লেখিকা

আমাদের গাড়ি যখন গ্রামের পথ ধরে ছুটে চলছে তখন দূরের বহু ক্ষেতে দেখতে পেলাম কৃষকেরা কাজ করছেন। কেউ কেউ জমির উপর ট্রাক্টর নিয়ে ছুটে চলছিলেন, কেউ কেউ ক্ষেত থেকে ফসল তুলছিলেন, দূর থেকে কাউকে দেখা গেলো কিছু ফসল কাঁধে তুলে পথ চলতে। শহরের ইট-পাথুরে জীবন দেখে অভ্যস্ত আমাদের জন্য এটুকুই অনেক বেশি পাওয়া, অনেক বেশি প্রশান্তির।

গ্রাম ও প্রকৃতির মিশেল উপভোগ করতে করতে আমরা যখন বালিয়াটি জমিদার বাড়িটির সামনে পৌঁছালাম তখন ঘড়িতে সময় দুপুর ১টা। ভাবলাম দ্রুতই সব জায়গাগুলো ঘুরে ফেলা যাবে। তবে সেখানে পৌঁছে জানতে পারলাম জমিদার বাড়ির মূল গেট বন্ধ, আর তা খোলা হবে ঠিক দুপুর আড়াইটায়। হতাশ হওয়া ছাড়া সেসময়ে আর কিছুই করার ছিলো না।

বালিয়াটির একটি মন্দিরের অংশ; সোর্স: লেখিকা

তবে সেই হতাশা বেশিক্ষণ কাউকেই ঘিরে থাকলো না। আমরা বেরিয়ে পড়লাম এখানকার আশেপাশের জায়গাগুলো ঘুরে দেখতে। এখান থেকে কিছুটা দূরেই রয়েছে ইশ্বর চন্দ্র বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়টিও বেশ দৃষ্টিনন্দিত। আমরা সেটি ঘুরে দেখলাম।

তাছাড়া জমিদার বাড়ির সামনে যে মাঝারি আকারের পুকুরটি রয়েছে তার অপর পাশেই আছে সুন্দর একটি মন্দির ও পুরনো কয়েকটি বাড়ি। এই জায়গাগুলো ঘুরেও সময় মন্দ গেলো না। মন্দিরটির পেছনের সিঁড়ি বাঁধানো ছোট্ট পুকুরটির পাড়ে বসে বেশ গল্পে কাটলো আমাদের সময়।

জমিদার বাড়ির ১নং প্রাসাদ; সোর্স: লেখিকা

যেহেতু জমিদার বাড়ির গেট বেলা আড়াইটার পূর্বে খুলবে না তাই আশেপাশের জায়গাগুলো ঘুরে নেয়ার পাশাপাশি আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম এ সময়ের মধ্যেই দুপুরের খাবার পর্ব সেরে নেবো। তবে এই স্থানটিতে খাবারের দোকান খুঁজে পেতে বেশ বেগ পেতে হলো। তাই মোটামুটি মানসিক প্রস্তুতি রাখবেন এ বিষয়টির জন্য।

স্থানীয় লোকদের দেখানো হোটেল অনুযায়ী এখানে হোটেলের দেখা পেলাম ৩টি। সবগুলোর অবস্থাই বেশ খারাপ। মোটামুটি মানের হোটেলও বলা যাবে না। আর বেশ নোংরাও। তবে উপায় না দেখে এখানেই খেতে হলো। কারণ মূল সদর এখান থেকে বেশ দূরে আর আমাদের জমিদার বাড়িও ঘুরে দেখা হয়নি তখনো।

জমিদার বাড়ির ৩নং প্রাসাদ; সোর্স: লেখিকা

জনপ্রতি ২০ টাকা মূল্যের টিকেট নিয়ে ঠিক আড়াইটায় আমরা জমিদার বাড়িটিতে প্রবেশ করলাম। দেখেই চোখ জুড়ানো যাকে বলে! মোট সাতটি সুন্দর স্থাপনা নিয়ে এই জমিদার বাড়িটি। পুরনো ঐতিহ্য ও রুচিশীলতার প্রতীক বুকে ধরে এখনো কালের সাক্ষী হিসেবে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে স্থাপনাগুলো।

সিংহদ্বার থেকে ভেতরে ঢুকলেই প্রথমে চোখে পড়ে বিশাল ৪টি প্রাসাদ। প্রাসাদ নং ১, প্রাসাদ নং ২, প্রাসাদ নং ৩, প্রাসাদ নং ৪ এভাবে ৪টি প্রাসাদে নম্বর জুড়ে রাখা। ২নং প্রাসাদটি পূর্বে রং মহল নামে পরিচিত থাকলেও বর্তমানে এটি এখানকার পুরনো ইতিহাস আগলে রাখা জাদুঘর। প্রথম ৩টি প্রাসাদ এখনো রঙিন ও সুন্দর থাকলেও ৪নং প্রাসাদটি বেশ পুরনো।

জমিদার বাড়িটির সবচেয়ে পুরনো প্রাসাদ; সোর্স: লেখিকা

সুন্দর কারুকার্য খচিত প্রাসাদগুলো দেখতে বেশ ভালো লাগছিলো। চকচকে প্রাসাদ ৩টির তুলনায় আমার রং ওঠা পুরনো প্রাসাদটিই বেশি ভালো লাগলো। আর এটির গায়ের কারুকার্য ও ডিজাইনও বেশ আলাদা। মাঝের প্রাসাদটির সামনে কৃত্রিম পানির ফোয়ারার একটি স্থান রয়েছে।

এই প্রাসাদ ৪টি পেরিয়ে এগিয়ে গিয়ে পেছনে দেখতে পেলাম জমিদারদের অন্দরমহল। এখানে বেশ কিছু ভবন রয়েছে। ভবনগুলো পুরনো হলেও সংরক্ষণ করে রাখায় এখনো বেশ ভালোভাবেই টিকে আছে। আর পুরো জমিদার চত্বরটি উঁচু প্রাচীরে ঘেরা।

জমিদার বাড়ির ফুল বাগান; সোর্স: লেখিকা

পেছনে রয়েছে বেশ সুন্দর একটি পুকুর। পুকুরের একপাশে রয়েছে শৌচাগার। পুকুরটির চারপাশে রয়েছে চারটি শান বাঁধানো ঘাট। শীতকাল হওয়ায় এই পুকুরটির পানি বেশ নিচের দিকে ছিল।

তবে বর্ষায় এই পুকুরটি জলে টইটুম্বুর থাকে। আর সে দৃশ্য কতটা সুন্দর হতে পারে তা আঁচ করতে পারছিলাম। তবে অল্প জলের ৪টি শান বাঁধানো ঘাটের পুকুরটির সৌন্দর্য বাড়িয়ে রেখেছিলো পুকুরের বেশ কিছু স্থানে ফুটে থাকা লাল শাপলা। পুকুরের সামনের অংশে একটি ফুলের বাগানও রয়েছে।

জমিদার বাড়ির অন্দরমহল; সোর্স: লেখিকা

বালিয়াটি প্রাসাদ, জমিদারদের অন্দরমহল, পুকুর, বাগান, গোলা বাড়ি, পূর্ব বাড়ি, পশ্চিম বাড়ি সব মিলিয়ে বেশ সুন্দর এই বালিয়াটি জমিদার বাড়িটি। সময় মন্দ যাবে না এখানে। তাছাড়া আপনার যদি আমার মতো প্রাচীন এসব স্থাপনার প্রতি প্রবল আগ্রহ থেকে থাকে তবে বেশ ভালো লাগবে।

জমিদার বাড়িতে প্রবেশের সময়সূচী:

গ্রীষ্মকাল- সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত।
বিরতি- দুপুর ১টা থেকে ১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত।

শীতকাল- সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত।
বিরতি- দুপুর ১টা থেকে ১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত।

শুক্রবার- দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট থেকে ২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত বিরতি।

বন্ধ- রবিবার পূর্ণদিবস ও সোমবার অর্ধদিবস সহ সরকারি ছুটির দিন। ঈদের পরের দিন বন্ধ থাকে।

টিকেট মূল্য:

বালিয়াটি জমিদার বাড়িতে দেশী দর্শনার্থীদের প্রবেশের জন্য জনপ্রতি টিকিটের মূল্য ২০ টাকা। বিদেশি দর্শনার্থীদের প্রবেশের জন্য জনপ্রতি টিকেটের মূল্য ২০০ টাকা ও সার্কভুক্ত দর্শনার্থীদের জন্য জনপ্রতি টিকেটের মূল্য ১০০ টাকা।

যেভাবে যাবেন:

৯ জনের দল নিয়ে আমরা গিয়েছিলাম মাইক্রো নিয়ে। তবে ফেরার সময় বাসে ফিরেছিলাম আমি।

ঢাকার গুলিস্তান, গাবতলী থেকে মানিকগঞ্জের উদ্দেশ্যে বাস ছেড়ে যায়। ভাড়া ১০০ টাকা (যে স্থান থেকেই ওঠেন বাসে)। শুভযাত্রা, পল্লীসেবা, শুকতারা ইত্যাদি বাসগুলোতে যেতে পারবেন। মানিকগঞ্জ বাস স্ট্যান্ড থেকে অনেকটা ভেতরে বালিয়াটি জমিদার বাড়ি। সেখানে যেতে পারবেন অটো বা সিএনজিতে।

ফিচার ইমেজ- লেখিকা

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
Booking.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *