‘পৃথিবীর ছাদ’ তিব্বত

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry

কয়েকশো বছর ধরেই ‘পৃথিবীর ছাদ’ পর্যটক এবং ভ্রমণপিপাসুদের চুম্বক আকর্ষণ হয়ে আছে। সৃষ্টির শুরু থেকেই এই প্রশস্ত ও উচ্চ মরুভূমি নিয়ে প্রচুর মিথ এবং কিংবদন্তির গল্প তৈরি হয়েছে। এখানকার পর্বতমালাগুলো হিন্দু দেবতাদের আবাসস্থল, প্রাকৃতিক দৃশ্য মুগ্ধ করার মতো, এখানের বৌদ্ধ মঠগুলো পূর্ণ হয়ে আছে প্রচুর শিল্প-সম্পদে এবং এখানের অধিবাসীরা ধর্মভীরু ও খুবই নম্র। 

সহজ ভাষায় বললে তিব্বতে ভ্রমণটা সারাজীবন মনে রাখার মতো এক অভিজ্ঞতা। তবে এখানে ভ্রমণ করাটা খুব একটা সহজ ব্যাপার নয়, প্রচুর বাধা-বিপত্তি আর নৈতিক সংকটে ভুগতে হয় অনেক ভ্রমণকারীকেই। নিম্নে তিব্বত ভ্রমণের ব্যাপারে কিছু নির্দেশিকা উল্লেখ করা হলো:

তিব্বতের রাজনীতি

পোতালা প্যালেস; সোর্স – ট্রাভেলমাইন ডট কম

তিব্বতের গল্পটা সবসময়ই একটু জটিল। বেশিরভাগ সময়ই এই অঞ্চলটা খর্ব হয়ে থাকে এর বিশাল প্রতিবেশি চীনের ছায়ায়। বিগত কয়েক শতাব্দী ধরেই চীনারা বিবাদে জড়িয়ে আছে তিব্বতের সাথে। বেশির ভাগ সময়ই তিব্বত গ্রাস হয়েছিল চীনের সাম্রাজ্যের কাছে, কিছু সময় তিব্বত ছিল স্বাধীন রাষ্ট্র, আর অল্প কিছু সময় তিব্বত ছিল চীনের চেয়েও শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান। তবে ১৯৫০ সাল থেকেই তিব্বতে শাসন চালাচ্ছে বেইজিং।

কিছু কিছু মতে তিব্বত যখন চীনের সাথে বিবাদে স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল তখন ক্ষমতা ও সম্পদটা সীমিত মানুষের হাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। তিব্বতের মানুষকেও ভুগতে হয়েছে নিরক্ষরতা এবং দারিদ্রতায়। চীন তিব্বতকে দখল করে নেওয়ার পর এখানে এসেছে আধুনিকতার ছোঁয়া, শিক্ষা এবং এসেছে এই উচ্চ সমতল ভূমিতে বেশ ভালো পরিমাণ অর্থ সম্পদ।

অবশ্য আরেকভাবে দেখলে মনে হবে তিব্বতের মানুষজনকে ভুগতে হচ্ছে নৃশংস ও স্বৈরাচারী সামরিক শাসনে, যেখানে ক্ষমতাবানদের সমালোচনা করার সুযোগ নেই, নেই কোনো বাকস্বাধীনতা। ধর্ম, সংস্কৃতি, ভাষা সবই চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাদের ওপর, এমনকি তিব্বত থেকে উত্তোলন করা সব খনিজ সম্পদও চলে যাচ্ছে চীনের সরকারের কোষাগারে। সত্যি বলতে কোনো পক্ষেই তেমন কোনো সুবিধাও নেই, নেই তেমন কোনো অসুবিধা। 

তিব্বতি লেক নাম; সোর্স – ট্রাভেলমাইন ডট কম

তাহলে কি ওখানে যাওয়া উচিৎ?

এই প্রশ্নের উত্তর আসলে নির্ভর করছে ভ্রমণকারীর মানসিকতার ওপর। এখানে ভ্রমণে যে টাকাটা খরচ হবে সেটা পুরোটাই যাবে বেইজিংয়ে। তবে মায়ানমারের মতো এখানে তেমন বড় কোনো ট্যুরিস্ট-বয়কটের ঘটনা ঘটেনি। তবে তিব্বতের বৌদ্ধদের দেশতাড়িত আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামার মতে, বিদেশি পর্যটকদের অবশ্যই তিব্বতে ভ্রমণ করা উচিৎ, এতে করেই তিব্বতীয়দের কঠিন জীবন-যাপন ফুটে উঠবে পুরো বিশ্ববাসীর কাছে।

তবে ওখানে যদি কেউ ভ্রমণ করেই, তবে তার অবশ্যই তিব্বতিয় ভ্রমণ কোম্পানিগুলোর একটির মাধ্যমেই যাওয়া উচিৎ। ওগুলোতে তিব্বতের স্থানীয় স্টাফরা কাজ করে এবং থাকার ক্ষেত্রেও স্থানীয়দের অধীনে থাকা গেস্টহাউজ এবং হোটেলে থাকাই ভালো।

হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত তিব্বতের সামার লেক; সোর্স – ট্রাভেলমাইন ডট কম

কীভাবে যাওয়া যাবে তিব্বতে?

পর্যটকদের মতে তিব্বতে ভ্রমণের প্রক্রিয়াটা খুবই জটিল ব্যাপার। কিছু ক্ষেত্রে ভ্রমণ করাটা আসলেই জটিল। তবে আবার কিছু ক্ষেত্রে ভ্রমণটা খুবই সহজ। প্রথমত, সোজা ভাষায় বললে তিব্বত হুটহাট করে ভ্রমণের জায়গা না। ব্যতিক্রম কিছু সময় ছাড়া এখানে স্বাধীনভাবে ভ্রমণ করা যায় না। তিব্বতের ভেতরে সাধারণ যানবাহনে করে ঘোরার কোনো উপায় নেই। এমনকি নিজের ইচ্ছামতো যখন যেকোনো সময়ে যেকোনো জায়গায় যাওয়ারও কোনো সুযোগ নেই।

সব পর্যটকেরই ভ্রমণের জন্য ট্রাভেল পারমিট থাকা লাগবে। এই পারমিট ছাড়া তিব্বতে যাত্রা করার কোনো সুযোগ নেই (এটা ছাড়া তিব্বত ভ্রমণের আর কোনো পথও নেই), আর এই ট্রাভেল পারমিটটা পাওয়া যাবে একমাত্র অর্গানাইজড ট্যুরের ক্ষেত্রেই।

তিব্বতের ধর্মানুসারীদের পবিত্র কৈলাস পর্বত; সোর্স – উইকিপিডিয়া

তিব্বতের ট্রাভেল পারমিট পেতে হলে প্রথমেই তিব্বতের যেসব জায়গা দেখার ইচ্ছা সেসবের একটা তালিকা জমা দিতে হবে এবং একবার তালিকা জমা দেওয়ার পর গন্তব্য বদলানোর বা নতুন কোনো গন্তব্য যোগ করার কোনো উপায় নেই। তাছাড়া নরওয়ের পাসপোর্টধারীদের তিব্বতে ভ্রমণের অনুমতিও নেই।

এটুকু শুনে ভ্রমণটাকে ঝামেলাপূর্ণ মনে হয়, তাহলে তার না যাওয়াই ভালো। এর কারণ তিব্বত ভ্রমণটা খুবই ব্যয়বহুল। আর তিব্বতে পৌঁছার পরও ভ্রমণটা খুব একটা সহজ হবে না। প্রতিদিন সকালে ট্যুর কোম্পানির জিপ এসে পর্যটকদের এক গন্তব্য থেকে তাদের তালিকায় থাকা অন্য গন্তব্য এবং হোটেলে নিয়ে যায়। আর এই সময়ে কম্পোলসারি ট্যুর গাইড ঐ গন্তব্যের ব্যাপারে বিস্তারিত জানায়। মানে ভ্রমণের আয়োজনটা যেমন অর্গানাইজড, তেমনি ভ্রমণটাও একদম অর্গানাইজড। এর বাইরে ব্যতিক্রম কিছু হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

পোতালা; সোর্স – yowangdu

ওখানে যাওয়াটা কি নিরাপদ?

হ্যাঁ, নিজেকে রাজনৈতিক আলোচনা, ঘটনা কিংবা ধর্মঘট থেকে দূরে রাখা যাবে ততক্ষণ পর্যন্ত পর্যটকদের জন্য তিব্বত খুবই নিরাপদ জায়গা। অবশ্য উচ্চতার কারণে অনেকের সমস্যা হতে পারে। বিশেষ করে লাসায় মধ্য ও নিচু উচ্চতার অঞ্চলের পর্যটকদের অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

ট্রেকিং করার কোনো উপায় আছে?

মানুষজন ট্রেক করে তিব্বতে ঠিকই, তবে এটা নেপাল নয়। এখানের সবচেয়ে প্রচলিত ট্রেকগুলোও খুব স্বল্প সময়ের (২-৪ দিন) এবং এখানে নেপালিদের মতো চা-বাগানও নেই। সোজা ভাষায় বললে, তিব্বতে ট্রেকিংয়ে বেরুলে ক্যাম্পিংয়ের পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েই বের হওয়া লাগবে।

তিব্বতে ট্রেকিংয়ের সবচেয়ে বড় অসুবিধাটা হলো এখানে ট্রেকিং খুবই ব্যয়বহুল। ভ্রমণের সাধারণ নিয়মটা এখানে সবসময়ই জারি থাকে। মানে ট্রেকিংয়ে বেরুলেও নিয়মানুযায়ী ট্রেকিংয়ের পুরোটা সময়ে একজন গাইড এবং জিপ ও ড্রাইভারকে নিয়োগ করে রাখতেই হবে। অবশ্যই জিপ-ড্রাইভার ট্রেক করার সময় সাথে থাকবে না, তারা হয়তো তখন লাসায় বসে আরামে বিশ্রাম করবে, কিন্তু তারপরও তাদেরকে ঠিকই টাকা দিয়ে যাওয়া লাগবে।

তিব্বতের লাসার পাশ দিয়ে বয়ে চলা ব্রহ্মপূত্র নদ; সোর্স – fineartamerica.com

শুনে একটু বেশিই কঠিন জার্নি মনে হচ্ছে? অন্য কোথাও গেলে কি তিব্বতিয়দের সাথে পরিচিত হওয়া যাবে?

সত্যি বলতে, যদি ঐতিহ্যগত তিব্বতিয় সংস্কৃতি দেখার ইচ্ছা থাকে, তবে তিব্বতের স্বাধীন ভূমিতে গেলে হতাশই হওয়া লাগবে। ঐতিহ্যগত তিব্বতি সংস্কৃতি ও বৈচিত্র্য দেখতে চাইলে তিব্বতের প্রতিবেশি চীনের কিংহাই এবং সিচুয়ান প্রদেশই হবে সঠিক গন্তব্য। এখানে ভ্রমণের কড়াকড়িও অনেক কম। তিব্বতের চেয়ে আরো সহজে ভ্রমণ করা সম্ভব নেপালের তিব্বতিয় অঞ্চল মাস্টাং এবং ডল্পোতে।

ফিচার ইমেজ – http://www.travelmyne.com

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
Booking.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *