নো ম্যান্স ল্যান্ডে নানা রঙের মেঘের খেলা

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry

হোস্টেলে গিয়ে মাধবীর নতুন এক অবস্থা হলো, যেটা এর আগে মাধবী কখনো কোনো কারণেই অনুভব করেনি। মাধবী যেন আর মাধবীর মাঝে নেই, হারিয়ে গেছে অন্য কোনো ভুবনে, অন্য কোনো পৃথিবীতে, অন্য কোনো অজানায়! যার ঠিকানা, সঠিক কারণ মাধবী নিজেই জানে না।

মাধবী যথেষ্ট চটপটে, ভালো বিতর্ক করে, সবার সাথেই দারুণ বন্ধুত্ব, হোক সে ছেলে বা মেয়ে, কারো সাথেই কখনো বন্ধুত্বের চেয়ে বেশি কোনো রকম সম্পর্ক হয়নি, মাধবীর তেমন ইচ্ছাই জাগেনি কখনো, আর অন্য কেউ সেভাবে ভেবে এগিয়ে আসার সাহসও পায়নি, ওর বিশেষ ব্যক্তিত্ব আর একটি অন্য রকম দূরত্ব বজায় রাখার জন্য। অথচ এমন নয় যে গম্ভীর, কথা কম বলে, কারো সাথে মেশে না। সবার সাথেই দারুণ একটা সম্পর্ক।

সবাই ওকে কিছুটা সমীহ বা শ্রদ্ধার চোখে দেখে। সমবয়সী হওয়া সত্ত্বেও কিন্তু এক-একজনকে এক-এক রকম ভাবে, ভক্তি-শ্রদ্ধা-স্নেহ-ভালোবাসার চোখে দেখা যায়। তাতে সম্পর্কটা যেমনই হোক। কে কার কাছে কীভাবে বিবেচিত হবে সেটা একেবারেই যার যার ব্যক্তিত্বের উপরে নির্ভর করে। এটা আদায় করে নেবার মতো কোনো বিষয় নয়। স্বভাব-চরিত্র-কার্যক্রম আর সার্বিক জীবন-যাপন এগুলো ইমেজ তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এটা চেয়ে নিতে হয় না, করে নিতে হয় না, এটা আপনা-আপনি চলে আসে, তৈরি হয়ে যায়।

সুখের জানালায় বিষাদের ছায়া! ছবিঃ সংগ্রহ 

মাধবীর ক্ষেত্রেও তেমনই হয়েছে। ওর সরলতা, ব্যক্তিত্ব, সবার সাথে সমানভাবে মেশা, সবার সাথে একই রকম আচরণ করা, যার সাথে যেমন উচিত বা যার যেটা প্রাপ্য, সবার বন্ধু হয়েও একটা অন্যরকম দূরত্বে রাখা নিজেকে। ওর এই ইমেজের কারণ, সবার কাছে ওর কথার, কাজের, স্বভাবের, মন্তব্যের একটা দারুণ গ্রহণযোগ্যতা আছে। যেটা মাধবী নিজেও বুঝতে পারে। যেটা ওকে অন্য রকম একটা আনন্দ আর আত্মসন্মানে গর্বিত করে। একমাত্র অধরার সাথেই মাধবী যা একটু বেশী মেশে, একটু না বেশ খানিকটা অন্য রকম বন্ধুত্ব। কারণ অধরাও অনেকটা মাধবীর মতোই, সবার সাথে বেশ ভালো বন্ধুত্ব কিন্তু কারো সাথেই একেবারে জানি দোস্তি নেই, নেই কোনো বিশেষ ভালো লাগার! নাহ নেই নয়, এখন আছে অরণ্য!

অধরা মাধবীর চেয়ে একটু বেশী চুপচাপ, শান্ত স্বভাবের, একটু লাজুকও। কথাও কম বলে বেশ। তবুও কীভাবে কীভাবে যেন চা বাগানে ক্যাম্পিংয়ে গিয়ে দেখা পেল অরণ্যর। আর ওদের মধ্যে হয়ে গেল এক অন্যরকম বন্ধুত্ব, যে বন্ধুত্ব এক সময় রূপ নিল আবেগ জড়ানো ভালোবাসায় আর বাধাহীন প্রেমে! যে ভালোবাসার টানে কত শত বাধা, ভিসার জটিলতা, অফিসের ছুটির সমস্যা, পারিবারিক টানা পোড়েন, এত বাধা বিপত্তি পেরিয়ে অরণ্য এসেছে অধরার সাথে দেখা করতে, ওর সাথে একটু বেড়াতে আরও কত কী কথা বলতে, ওকে একটুখানি ছুঁয়ে দেখতে।

কিন্তু এসব কী হচ্ছে? এই এক দিনেই যেন কেমন এলোমেলো লাগছে মাধবীর নিজেকে। কেমন একটা অপরাধবোধ আবার একটা অন্য রকম ভালোলাগা, আবেশ, আবেগ আর অজানা আনন্দ ছুঁয়ে যাচ্ছে ওকে! কিন্তু ও তো কোনো অপরাধ করেনি, তবে কেন অপরাধ বোধ? আবার এত আনন্দে, আবেগে আর আবেশেই বা কেন ডুবে যাচ্ছে, সেটাও বুঝতে পারছে না! তবে যাই হোক মন্দ লাগছে না কিন্তু ওর এই মিশ্র অনুভূতি।

কষ্টের কান্না, দুঃখের বৃষ্টি। ছবিঃ সংগ্রহ 

অধরার অরণ্য অধরারই আছে আর অধরারই থাকবে… এখানে মাধবীর কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই, থাকতে পারে না, থাকতেও নেই। তবুও মাধবীর ভাবনায়, কল্পনায় আর সমস্ত চেতনায় কীভাবে কীভাবে যেন জড়িয়ে গেছে অরণ্য, জড়িয়ে আছে অরণ্য, ঘটনাচক্রে আর বাস্তবতার ঘেরাটোপে! সমস্ত সত্তা জুড়ে ছুঁয়ে আছে অরণ্য মাধবীকে! অরণ্যর সাথে এক জীপে করে, ওর পাশে বসে মিরিক যাওয়া, মিরিক লেকের ভেজা রাস্তা ধরে, পাথরের রাস্তা দিয়ে, জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে, পাহাড়ের চূড়ায় ওঠা, মেঘের মাঝে হারিয়ে যাওয়া, ভিজে-ভিজে একাকার হওয়া, গানে-গানে ভেসে যাওয়া।

আর এরপর… একসাথে জীপের ছাদে, জীপের টায়ারে বসে, পাহাড়ি আঁকাবাঁকা ভয়ানক বাঁকের রাস্তায়, গাছের ডালের আঘাত সয়ে, বাঁশের কঞ্চির ছোবল খেয়ে, কখনো আলিঙ্গনে বেঁধে, কখনো বুকের মাঝে হারিয়ে গিয়ে, কখনো একে অন্যের বাহুতে মিশে গিয়ে, সবুজ চা বাগানের মাঝে মিশে, সাদা মেঘে ভেসে, নীল পাহাড়ে হারিয়ে, বর্ণিল বিকেলে সেজে যে ওরা পৌঁছেছিল শিলিগুড়ি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে!

তাই অরণ্য মাধবীর জীবনের এক অনন্য আনন্দ দিয়ে, স্মৃতির আকাশের ধ্রুবতারা হয়ে, একা-একা হাসার, একা-একা কাঁদার অকারণ কারণ হয়ে, সুখ হয়ে, দুঃখ হয়ে, মেঘ হয়ে, ছায়া হয়ে, পাহাড় হয়ে, অরণ্য হয়ে রয়ে যাবে অনন্তকাল, অনন্ত সময়, অনন্ত যুগ ধরে!

ধুসর পৃথিবী। ছবিঃ লেখক 

তাই মাধবী ভেবে রাখলো, কাল সকালে ও আর যাবে না অরণ্য আর অধরার মাঝে কোনো দেয়াল হতে! মাধবী পারবে না সাক্ষী হতে কোনো কষ্টের, কোনো দুঃখের, কোনো না পাওয়ার বেদনার স্মৃতি হতে, কোনো কিছু হারাতে! যা পেয়েছে তা থাকুক সেভাবে, অটুট, অমলিন, অনিঃশেষিত আর অপার্থিব কিছু হয়ে।

মাধবী অধরাকে ফোনে জানালো, ওর বাড়ি থেকে জরুরি ফোন এসেছে, ওকে আজ রাতেই বাড়ি যেতে হচ্ছে! সকালে আর দেখা হবে না। পরে ফিরে এসে অধরার কাছে শুনবে অরণ্য আর অধরার বাকি গল্প, আবারো “নো ম্যান্স ল্যান্ডে!” ওদের বিচ্ছেদের গল্প! অরণ্যর আর অধরার জন্য সহস্র শুভ কামনা জানিয়ে ফোন কেটে দিল।

আর এরপর নিজের অজান্তেই ডুকরে উঠলো! কখন যেন চোখ ভরে গেছে জলে, জামা ভিজে গেছে অশ্রুধারায়, এক হয়ে একাকার হয়েছে নাকের আর চোখের জল! কিছুই বুঝে উঠতে পারেনি এতক্ষণ! যতক্ষণ কথা বলছিল অধরার সাথে। ফোন রাখার পর, আয়নায় নিজের কান্না ঝরা মুখ দেখতে পেয়ে আর ধরে রাখতে পারলো না নিজেকে… নিজের চরিত্রের ঠিক উল্টোভাবে গুমরে উঠলো মুখে কাপড় গুঁজে দিয়ে…

যেন শুনতে না পায়, নিজেই নিজের কান্না!

The post নো ম্যান্স ল্যান্ডে নানা রঙের মেঘের খেলা appeared first on Trip Zone.

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
Booking.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *