তেওতা জমিদার বাড়ি ভ্রমণ কথন

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry

মানিকগঞ্জে রয়েছে বেশ কিছু জমিদার বাড়ি। পুরনো স্থাপনার প্রতি প্রবল আগ্রহ থাকায় সুযোগ পেলেই বাংলাদেশের জমিদার বাড়িগুলো ঘুরে দেখার চেষ্টা করি। ঢাকা থেকে মানিকগঞ্জের দূরত্ব খুব বেশি না হওয়ায় একদিনেই ঘুরে দেখা সম্ভব এ জেলার বেশ কিছু জায়গা। কিছুদিন আগেই সুযোগ করে ঘুরে এলাম। এবারে আমার মানিকগঞ্জ ভ্রমণ ডায়েরি থেকে থাকছে তেওতা জমিদার বাড়ি ভ্রমণ কথন।

ঢাকা থেকে তেওতা জমিদার বাড়ির দূরত্ব প্রায় ৯০ কিলোমিটার। তবে ঢাকা থেকে আমরা প্রথমেই গেলাম বালিয়াটি জমিদার বাড়ি। বালিয়াটি জমিদার বাড়ি ঘুরে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য তেওতা জমিদার বাড়ি। আমরা যখন বালিয়াটি গ্রামে পৌঁছালাম তখন দুপুরের বিরতি চলছিলো। অপেক্ষা করতে হলো বেলা আড়াইটা পর্যন্ত। এ বিরতিতেই পরিকল্পনা কিছুটা নড়বড়ে হয়ে গেলো আমাদের।

তেওতা জমিদার বাড়ির একাংশ; সোর্স: লেখিকা

বালিয়াটি জমিদার বাড়ি অবস্থিত সাটুরিয়া উপজেলার বালিয়াটি গ্রামে এবং তেওতা জমিদার বাড়ি অবস্থিত শিবালয় উপজেলার তেওতা গ্রামে। এই দুটো গ্রামের মধ্যকার দূরত্ব বেশ খানিকটা। যাতায়াতে মোটামুটি ঘণ্টা দুয়েক লেগে যাবে। আর সেদিন বালিয়াটি জমিদার বাড়ি থেকে বের হতেই আমাদের বিকেল চারটা বেজে গেলো।

তবুও আমরা সবাই তেওতার পথ ধরলাম। এত দূর থেকে এই জমিদার বাড়িটি না দেখে যাওয়ার পক্ষে ছিলাম না কেউই। ড্রাইভারকে পথ বুঝিয়ে দিয়ে আমরা শুরু করলাম আমাদের আরেক গন্তব্যে পথচলা। গ্রামের আঁকাবাঁকা পথ ধরে গাড়ি ছুটে চললো বালিয়াটি ফেলে তেওতার দিকে।

তেওতা জমিদার বাড়ি; সোর্স: লেখিকা

শীতকাল হওয়ায় সন্ধ্যা চটজলদি নেমে আসে বিকেলের পর। অন্ধকারও হয়ে যায় বেশ। এলাকাটি গ্রাম হওয়ায় কুয়াশাও থাকার কথা। তাই আমাদের চিন্তা ছিল অন্ধকার হয়ে আসার পূর্বেই জমিদার বাড়িটি ঘুরে দেখা। ভাগ্যিস সেভাবেই পৌঁছে যেতে পেরেছিলাম!

বালিয়াটি জমিদার বাড়ির মতো খুব ভালোভাবে সংরক্ষিত নয় তেওতা জমিদার বাড়িটি। প্রাচীনত্বের পরিপক্ব ঘ্রাণ টের পাওয়া যায় এখানকার পুরো জায়গাটিতে। পুরনো রং ওঠা দেয়াল, আগাছায় ঘিরে থাকা মাটি আর বহুবছর আগে দাঁড় করানো দালানগুলো দেখতে বেশ ভালো লাগছিলো। সঙ্গে বিকেলের শেষভাগের অদ্ভুত এক গাম্ভীর্য মিশে সে সৌন্দর্যকে আরো বাড়িয়ে তুলেছিলো।

তেওতা জমিদার বাড়ির প্রাচীন দেয়াল; সোর্স: লেখিকা

বালিয়াটি জমিদার বাড়ির প্রাসাদগুলোর ছাদে ওঠার পথ খুঁজছিলাম সবাই। তবে সবগুলো পথই বন্ধ ছিল। তেওতা জমিদার বাড়িতে এসে সে আফসোস ঘুচলো সবার। এখানকার মূল দালানটির ছাদে ওঠার সুযোগ হলো আমাদের।

ছাদে দাঁড়িয়ে চারপাশ দেখতে বেশ ভালো লাগছিলো। তাছাড়া এই জমিদার বাড়িটির ছাদে বসে সন্ধ্যা নামতে দেখার পাশাপাশি অনুভব করছিলাম এ বাড়িতে বসবাসরত ব্যক্তিদের পুরনো দিনগুলো, কাজী নজরুল ইসলাম ও তার সহধর্মিণীর কাটানো সময়গুলো। গল্প, কবিতা কিংবা উপন্যাসের পাতার মতো অদ্ভুতভাবে অনুভব করছিলাম সময়টুকু। যেন পুরনো বহুদিন আমিও কাটিয়ে গেছি এই বাড়িতে, এর পুকুরঘাটে।

মূল প্রাসাদের ভেতরের একাংশ; সোর্স: লেখিকা

তেওতা জমিদার বাড়িটি মোট ৭.৩৮ একর জমির উপর স্থাপিত। এই জমিদার বাড়িটির মূল প্রাসাদের চারপাশে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা। ভালোভাবে ঘুরে দেখতে বেশ সময় লাগবে। তাই বেশ খানিকটা সময় হাতে নিয়েই যাওয়ার চেষ্টা করবেন।

এই জমিদার বাড়ির প্রাসাদের মূল ভবনটি লালদিঘী ভবন নামে পরিচিত। এখানে একটি নটমন্দিরও রয়েছে। এছাড়াও এখানে রয়েছে নবরত্ন মঠ সহ আর বেশ কয়েকটি মঠ। সবগুলো ভবন মিলিয়ে এখানে মোট কক্ষ রয়েছে ৫৫টি। এর প্রায় সবগুলোই এখন জরাজীর্ণ। এছাড়াও এ বাড়িটিতে রয়েছে একটি বড় পুকুর।

পুরনো জমিদার বাড়ি; সোর্স: লেখিকা

প্রায় সপ্তদশ শতকে এই জমিদার বাড়িটি নির্মাণ করা হয়েছিলো বলে ধারণা করছেন ইতিহাসবিদরা। কথিত আছে, এটি নির্মাণ করেছিলেন পঞ্চানন সেন নামক একজন জমিদার। তার পরবর্তীতে এ অঞ্চলে জমিদারি প্রতিষ্ঠিত করেন জয়শংকর ও হেমশংকর নামের দুই ভাই। ভারত বিভক্তির পর তারা দুজনেই ভারত চলে যান ও এই জমিদার বাড়িটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে।

যমুনা নদীর কোল ঘেঁষা এই জমিদার বাড়িটি কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রাচীনত্বের গল্প জমা বাড়িটি যমুনার বহমান জলের মতো বহন করে আসছে বহু ইতিহাস। নির্মাণশৈলী ও কৌশলগত দিক থেকে এই জমিদার বাড়িটির মূল ভবনটিতে মুঘল ও ইউরোপীয় স্থাপত্যের এক চমৎকার মিশ্রণ দেখতে পাওয়া যায়।

তেওতা জমিদার বাড়ির অংশ; সোর্স: লেখিকা

জমিদারদের জীবন ইতিহাসের পাশাপাশি এই জমিদার বাড়িটিতে রয়েছে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিচিহ্ন। এ বাড়িটিতেই থাকতেন কাজী নজরুল ইসলামের সহধর্মিণী প্রমিলা দেবী। এ প্রাসাদে দেখেই প্রথম কবি তার প্রেমে পড়েছিলেন। তার জন্য কবিতা লিখেছিলেন।

আমাদের ঘুরে দেখার ফাঁকে সময় খুব দ্রুত চলতে লাগলো। পশ্চিমের আকাশ কমলাটে হয়ে যখন সূর্য ডুবতে শুরু করলো, তখন আমরা তড়িঘড়ি করে নেমে এলাম ছাদ থেকে। নাম না জানা অনেক পাখি তখন উড়ে যাচ্ছিলো জমিদার বাড়ির উপর থেকে। আশেপাশের গাছগুলোতে বাসা নিশ্চয়ই ওদের!

সূর্য, পাখি, বিকেল সবারই বাড়ি ফেরার তাড়া। শীতের সন্ধ্যাটা অনেকটা অন্ধকার নিয়ে নেমে পড়লো মুহূর্তেই। স্মৃতির ঝুলিতে বেশ কিছু গল্প তুলে আমরাও তাদের অনুসরণ করে বাড়ি ফেরার পথ ধরলাম।

যেভাবে যাবেন:

আমরা ঢাকা থেকে ৯ জন মেয়ের একটি দল গিয়েছিলাম মাইক্রো বাস নিয়ে। সারাদিনের জন্য রিজার্ভ করে নিয়েছিলাম। তবে বাসেও যেতে পারবেন। এতে খরচও বেশ কমে আসবে। ঢাকার গুলিস্তান বা গাবতলী থেকে বাসে প্রথমেই যেতে হবে আরিচা ঘাট। ভাড়া পড়বে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা।

আরিচা ঘাট নেমে সেখান থেকে অটো রিকশা বা সিএনজিতে যেতে পারবেন তেওতা জমিদার বাড়ি। ভাড়া পড়বে ৩০ টাকা।

ফিচার ইমেজ- vromonguide.com

The post তেওতা জমিদার বাড়ি ভ্রমণ কথন appeared first on Trip Zone.

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
Booking.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *