জয়পুর স্টেশনের নান্দনিকতা

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry

জয়পুর রেলস্টেশন হলো পুরো ভারতের মধ্যে সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন রেলস্টেশনের মর্যাদা পাওয়া- এ কথা শুনেছিলাম লোক মুখে। যে কারণে এমনিতেই এই স্টেশনে ট্রেন থেকে নামার আগে এটা নিয়ে বেশ কৌতূহল ছিল ভেতরে ভেতরে। কারণ এর আগে কেরালার ইরনাকুলাম রেলস্টেশন আমাকে ভীষণভাবে মুগ্ধ করেছে তার আতিথেয়তা দিয়ে, ঝকঝকে, চকচকে পরিবেশ আর প্লাটফর্ম দিয়ে। তাই মনের অজান্তেই ইরনাকুলামের সাথে একটা তুলনা চলেই এসেছিল।  

তো জয়পুর স্টেশনে যখন নামি তখনো রাত শেষ হতে কিছু সময় বাকি আছে। সেই আলো আধারির মাঝে যেটুকু দেখলাম তাতে পরিচ্ছন্ন নিঃসন্দেহে বলা যায়, তবে ইরনাকুলামের সাথে তুলনা করার মতো কিনা সেটা বোঝা যাচ্ছিল না। তবে স্টেশনে নেমেই সারা রাতের শীতের কষ্ট দূর হয়ে গিয়েছিল সেই গল্প বলেছি আগেই। এরপর বিশ্রাম নিয়ে যখন স্টেশন দেখতে বের হলাম। প্রতিটি পদক্ষেপে পুরো স্টেশনের নান্দনিকতা আমাকে অভিভূত করে তুলছিল। আর অবাক হয়ে পুরো স্টেশনের একমাথা থেকে আর এক মাথা হেঁটে বেড়িয়েছিলাম। কেন নয়?

প্লাটফর্মের দেয়ালচিত্র। ছবিঃ লেখক

কারণ এটা যে আসলেই একটি রেলস্টেশন আর আমি যে কোনো রেলস্টেশনেই হেঁটে বেড়াচ্ছি সেটাই যে ভুলে গিয়েছিলাম বা ভুলে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম এর নান্দনিকতা, চারদিকের পরিবেশ, পরিচ্ছন্নতা, ঝকঝকে আর তকতকে নানা রকমের অভিজাত ছবি দেখে।

দেয়ালে দেয়ালে যেখানেই চোখ যায় প্রাচীন রাজা প্রজাদের নানা রকম দেয়াল চিত্রে সেজে থাকা স্টেশনের সাজ দেখে বিমোহিত হয়ে যাই। গেটের কাছে গিয়ে তো আরও অবাক হলাম বিশাল বিশাল সাইজের নানা রকমের কারুকাজের কত রকমের দেয়াল চিত্র যে জ্বলজ্বল করছে, না দেখলে বোঝানো মুশকিল।

জয়পুর স্টেশনের পর্যটক কক্ষ। ছবিঃ লেখক

কাঁচের গেটের কাছে সদা সতর্ক পুলিশ সদস্য রয়েছে সব সময় যে কাউকে, বিশেষ করে বাইরের পর্যটকদের সাহায্য করার জন্য। আমাদের নানা রকম দরকারি পরামর্শ দিয়েছিলেন বেশ আন্তরিকতার সাথেই। ঠিক সেই সময় দুটি তুলনা মাথায় চলেই এলো।

এক, এর আগে আমার অভিজ্ঞতায় পাওয়া রেলস্টেশন ইরনাকুলাম আর দ্বিতীয়ত আমাদের রেলস্টেশনগুলোর সাথে ওদের রেলস্টেশনের তুলনা। হায় আমাদের রেলস্টেশনে গন্ধে দাঁড়িয়ে থাকা দায় হয়ে যায় আর এখানে গন্ধ তো দূরের কথা কোথাও এক টুকরো ময়লা বা কাগজ পর্যন্ত নেই, ভাবা যায়!

কাঁচের মতো মেঝে! ছবিঃ লেখক

স্টেশনের সাথে লাগোয়া বা বলা যায় স্টেশনের মধ্যেই ছোট ছোট চায়ের স্টল থেকে একটা চা আর ৫ রুপীর বিস্কিট হাতে নিয়ে প্রাথমিক আহার করছিলাম আর ধীরে ধীরে হেঁটে হেঁটে দেখছিলাম স্টেশনের ভেতরের নানা রকম অফিস, অফিসের ভেতরের সাজসজ্জা, দেয়ালচিত্র, কর্মকর্তাদের কাজকর্ম আর বিশেষ করে সবকিছু মিলে পুরো স্টেশনের নান্দনিক ব্যাপার-স্যাপার।

যতই দেখছিলাম ততই মুগ্ধ হচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম ইশ আমাদের কোনো একটা স্টেশনও যদি এমন পরিচ্ছন্ন হতো, এমন দেয়ালচিত্র বা নান্দনিকতা দূরে থাকুক, সেই পরিচ্ছন্নতা নিয়েই যে কত গল্প লিখতে পারতাম কে জানে!

দেয়ালচিত্র। ছবিঃ লেখক

সেই আফসোস নিয়েই সবাইকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম পুরো দিনের মতো। সারা দিনের নানা জায়গা, স্থাপনা, জলমহল, যন্তরমন্তর দেখে দেখে ক্লান্ত হয়ে যখন ফিরেছিলাম জয়পুর রেলস্টেশনে, তখন শেষ বিকেল। স্টেশনের বাইরে থেকে যেখানে অটো নামিয়ে দেয় সেখান থেকে স্টেশনের মূল প্লাটফর্মে ঢুকতে হাঁটতে হয় ৫-১০ মিনিটের মতো প্রায়। অসুস্থ, বৃদ্ধ আর অক্ষম ব্যক্তিদের ছাড়া অবশ্যই।

সেই পথে হেঁটে ফিরতে ফিরতে আবারো সকালের সেই প্রশ্ন মাথায় ঘুরতে লাগলো। এটা কি আসলেই কোনো রেলস্টেশন? আমরা কী আসলেই কোনো রেলস্টেশনে যাচ্ছি, নাকি কোনো পার্ক, মানুষের অবসর কাটানোর কোনো জায়গা, অলস সময় এখানে সেখানে বসে পার করার মতো কোনো স্থাপনার আয়োজন?

জি এটি জয়পুর রেলস্টেশনের টিকেট ঘরের সামনের মেঝে! ছবিঃ লেখক

কেন ভাববো এমন? চারপাশের পরিবেশ, পরিচ্ছন্নতা, মানুষজন আর তাদের আচার-আচরণ দেখে তো তেমনই মনে হলো যে এটা হয়তো কোনো পার্ক বা এমন আয়েশি কোনো স্থান। রেলস্টেশনের যে চিরাচরিত রূপ আমরা দেখে থাকি এটা তার কাছাকাছিও নয়।  

ঝকঝকে লাল ইটের ছায়া ঘেরা টিকেট ঘরের ভেতরে সবাই টিকেট কাটা নিয়ে কিছুটা ব্যস্ত সময় পার করলেও, বাইরে সবাই বসে গল্প করছে ইটের মেঝের উপরেই, কেউ আয়োজন করে গল্প করছে, কেউ খাওয়া দাওয়া করছে, কেউ গাছের ছায়ায় বসে হয়তো কারো জন্য অপেক্ষা করছে। পাশেই অন্যান্য কমন রেলস্টেশনগুলোর মতো একটা প্রাচীন কিন্তু ঝকঝকে কয়লার ইঞ্জিনের প্রদর্শনী দেখে মনে হলো, হ্যাঁ এটা হয়তো কোনো রেলস্টেশনই! আর দূরের জয়পুর জংশনের আলোকিত সাইনবোর্ড তেমনটাই জানান দিচ্ছিল। আর আমাকে বলছিল যে বাছা, এটা রেলস্টেশনই। এত অবাক হবার কিছু নেই হে!

জয়পুর রেল জংশন। ছবিঃ লেখক

এরপর ছেলের মাকে ভেতরের ওয়েটিং রুমে বিশ্রাম করতে রেখে এসে বাপ-বেটা মিলে পুরো জয়পুর রেলস্টেশনের নান্দনিকতা, স্বচ্ছতা, আধুনিকতা, সাজসজ্জা, নানা রকম আন্তরিক আয়োজন উপভোগ করেছিলাম বেশ সময় নিয়ে আর ধীরে ধীরে। সেই সাথে ধারণ করেছিলাম স্মৃতি ধরে রাখার জন্য মোবাইল আর ক্যামেরায় কিছু ছবি, কিছু মুহূর্ত, কিছু অবাক করার মতো বাস্তবতা। বিস্মিত হয়েছিলাম কোনো একটা স্টেশন যে এতটা, ঝকঝকে, এতটা স্বচ্ছ, এতটা পরিচ্ছন্ন, এতোটা পরিপাটি সাজে সেজে থাকতে পারে বা রাখতে পারে তার প্রতিটি দেয়ালে দেয়ালে চিত্র ধরে রেখে বনেদী আভিজাত্যের জানান দিতে পারে সেটা দেখে, ভেবে আর উপলব্ধি করে।

টিকেট ঘর। ছবিঃ লেখক

সত্যি পুরো জয়পুর রেলস্টেশনটাই একটা অবাক ব্যাপার। সবকিছু দেখে দেখে একটা আফসোস শুধু বার বার করেছি, ইশ আমাদের কোনো রেলস্টেশন যদি এমন হতো? এমন পরিচ্ছন্ন, এমন নান্দনিক আর এমন সুযোগ সুবিধা সম্পন্ন, তবে কতই না ভালো হতো, কী দারুণ একটা ব্যাপার হতো, কতটা গর্বিত হতে পারতাম আমরাও।

The post জয়পুর স্টেশনের নান্দনিকতা appeared first on Trip Zone.

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
Booking.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *