ছাগলনাইয়ার বাঁশপাড়ায় জমিদার বাড়ি ও সাত মঠের ইতিবৃত্ত

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry

ফেনীর অধিবাসী আহমেদ ইশতিয়াক ভাইয়ার কাছ থেকে জানতে পারি বাঁশপাড়া জমিদার বাড়ি আর মঠের কথা। ম্যাপে বাঁশপাড়া জমিদার বাড়ির কথা খুঁজে পাইনি, কিন্তু বাঁশপাড়া আছে। জায়গাটা ফেনী থেকে ছাগলনাইয়া বাজারে যাবার একটু আগেই। ভাবলাম, কাউকে জিজ্ঞেস করলে জমিদারবাড়ি যাবার রাস্তা বলে দিতে পারবে।

অনুমিত বাঁশপাড়া জমিদার বাড়ি; source: মাদিহা মৌ

বাঁশপাড়া যাওয়ার লোকাল সিএনজি নেই। সিএনজিগুলো সব যায় ফেনীর দিকে। এত কাছাকাছি জায়গার যাত্রী তোলে না। তাই ভাবলাম, একটা সিএনজি রিজার্ভ করে ফেলি জমিদার বাড়ি আর মঠ ঘোরার জন্য। সিএনজিওয়ালা ১৫০ টাকা চাইলো। দামাদামি করে ৮০ টাকায় রফা হলো। ওমা! ছাগলনাইয়া বাজার থেকে বেরিয়ে পাঁচ মিনিটের মধ্যেই সিএনজি আমাদের সাত মঠের সামনে নামিয়ে দিচ্ছে। এইটুকু রাস্তার জন্য ৮০ টাকা নিলো! হেঁটেই আসা যেত। রাগ হলো প্রচণ্ড। বললাম, ‘আমাদের বাঁশপাড়া জমিদার বাড়ি নিয়ে যান’।

সে বলে, এরকম কিছু চেনে না। এই এলাকায় এসব কিছু নেই। তাহলে এত ভাড়া নিলো কেন? জবাব নেই। গজগজ করছে। মেইন রাস্তায় নিয়ে যেতে বললাম। নিয়ে গেল। আশেপাশের লোকজনকে জিজ্ঞেস করে একই জবাব পেলাম। এরকম কিছু তারা চেনে না।

পুরোটা স্থাপনা জুড়ে রয়েছে অনেকগুলো প্রবেশদ্বার; source: মাদিহা মৌ

অগত্যা সাতমঠের রাস্তার দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। সাতমঠ পৌঁছার আগেই একটা ভাঙাচোরা স্থাপনা পেলাম। ঠিক জমিদার বাড়ির মতো নয় আবার মঠের মতোও নয়। দুটোর সংমিশ্রণ। ওটার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে মনে হলো, এটিই বাঁশপাড়া জমিদার বাড়ি নয়তো? যতদূর জানি, ছাগলনাইয়ার হিন্দু জমিদার বিনোদ বিহারির বাড়িটি আট একর জায়গা জুড়ে নির্মিত। এটা তো এত বেশি জায়গা দখল করেছে বলে মনে হচ্ছে না। অবশ্য কালের পরিক্রমায় বাদ বাকি স্থাপনাগুলো ধ্বংস হলেও হতে পারে। দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালের দিকে জমিদার বিনোদ বিহারি কলকাতা চলে যান। বাড়িটির কোনো ব্যবস্থা না করেই তিনি চলে গিয়েছিলেন।

কাছে গিয়ে দেখলাম, পুরোটা স্থাপনা জুড়ে অনেকগুলো প্রবেশদ্বার আছে। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে ভেতরে গেলাম। ঠিক মাঝে একটা বেদীমতোন আছে। এটা দেখে মনে হচ্ছে, এখানে প্রতিমা স্থাপন করা হতো। এটা হয়তো কোনো মন্দির ছিল। এতোটা বাজে অবস্থায় জমিদার বাড়ির মন্দির খুব কমই দেখেছি। ভেতরটা এখন টাট্টিখানায় পরিণত হয়েছে। বেরিয়ে এলাম। এরকম অবস্থায় বেশিক্ষণ থাকা যায় না।

স্থাপনাটি ঠিক জমিদার বাড়ির মতো নয় আবার মঠের মতোও নয়। দুটোর সংমিশ্রণ; source: মাদিহা মৌ

সাত মঠের দিকে পা বাড়িয়েছি। মঠের একপাশে একটা পুকুর আছে। সাতটা মঠ একসারিতে নয়, দুটো সারিতে দাঁড়িয়ে আছে। এক সারিতে তিনটি, অন্য সারিতে চারটি। এভাবে একটা সমকোণ তৈরি করেছে। গাছপালার কারণে প্রায় ঢেকে যাওয়া মঠগুলোর অবস্থাও সঙিন। এগুলোর ভেতরেও বাঁশপাড়া মন্দিরটির মতোই অবস্থা।

সাতমঠের একটির মাথা গেছে ভেঙে। তাই দূর থেকে ছয়টির মাথা দেখা যায়। এগুলো মূলত চিতা মন্দির। এজন্য বিনোদ বিহারির বাড়িটির নাম সাত মন্দির বাড়ি বা রাজবাড়ি বা সাত মঠ হিসেবে পরিচিত পেয়েছে।

চার মঠ; source: মাদিহা মৌ

পুরনো স্থাপনার প্রতি আকর্ষণের কারণে আমি বাংলাদেশ জুড়ে নড়বড়ে অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা প্রচুর মঠ দেখেছি। নড়বড়ে হলেও বেশিরভাগ মঠের ভিত্তি খুবই মজবুত ছিল। এই মঠগুলোও তার ব্যতিক্রম নয়। এতসব জায়গার মঠের মধ্যে এই মঠগুলোর মতো কারুকাজ দেখেছি আর কেবল গাজীপুরের ভাওয়ালে রাজশ্মশানেশ্বরীতে। ভাওয়াল শ্মশান মঠবাড়িতে ছিলো আটটি মঠ। আর ফেনীর এই বাঁশপাড়ায় সাতটি। এত সংখ্যক কারুকাজমণ্ডিত মঠ হয়তো বাংলাদেশের এই দুই জায়গাতেই আছে।

অথচ সেই পুরনো আফসোস এসব জায়গায় মাথা কুটে মরে। আমরা আমাদের ঐতিহ্যময় ইমারতগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করতে জানি না। কিন্তু চাইলেই এই মঠগুলো প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অন্তর্ভুক্ত করে, এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করে পর্যটনকেন্দ্র কিংবা অবসর যাপন করার ব্যবস্থা করা যায়। এত চমৎকার সব স্থাপনা অবহেলায় অনাদরে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, তা আমাদের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক।

সাতমঠের একটির মাথা গেছে ভেঙে; source: মাদিহা মৌ

জায়গাটি যেহেতু কোনো ভ্রমণস্থান নয়, তাই আশেপাশের লোকজন আমাদের ঘুরে ঘুরে দেখছিলো। তারা ভেবেই পাচ্ছিলো না, কীসের জন্য আমরা তাদের গ্রামে হানা দিয়েছি। সহজে পাওয়া সৌন্দর্য সত্যিই খুব উপেক্ষিত হয়, এটা চিরন্তন সত্য।

তিন মঠ; source: মাদিহা মৌ

কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে ট্রেনে ও বাসে ফেনী যাওয়া যায়। ট্রেনে যেতে চাইলে চট্টগ্রামগামী রাতের শেষ ট্রেন তূর্ণা নিশিথায় যেতে পারেন। রাত সাড়ে ১১টায় কমলাপুর থেকে ছেড়ে যাওয়া তূর্ণা নিশিথায় ফেনী পৌঁছে সাড়ে চারটায়। ভাড়া ২৬৫ টাকা।

আবার কম খরচে চট্টগ্রাম মেইলে যেতে পারেন। ভাড়া পড়বে মাত্র ৯০ টাকা। চট্টগ্রাম মেইল কমলাপুর থেকে ছাড়ে রাত সাড়ে দশটায়। সাত ঘণ্টা লাগবে ফেনী পৌঁছাতে। বাসে যেতে চাইলে, এনা ট্রান্সপোর্টে ও স্টার লাইনে যেতে পারেন। ভাড়া ২৭০ টাকা।

গাছপালার কারণে প্রায় ঢেকে যাওয়া মঠগুলো; source: মাদিহা মৌ

ফেনী স্টেশন রোড থেকে ছাগলনাইয়ার সিএনজি পাওয়া যায়। ভাড়া ২৫ টাকা প্রতিজন। ছাগলনাইয়া বাজার থেকে সাতমঠ ও বাঁশপাড়া জমিদার বাড়ি খুবই কাছে। সিএনজি নিলে অতিরিক্ত ভাড়া নেবে। এটুকু পথ হেঁটেই চলে যেতে পারবেন। ছাগলনাইয়া বাজারে যে কাউকে সাতমঠ কিংবা সাত মন্দির যাওয়ার উপায় জিজ্ঞেস করলে বলে দেবে। আবার ফেনী থেকে ছাগলনাইয়া আসার পথে সিএনজিচালককে বললে সে হয়তো সাতমঠ যাওয়ার গলির সামনে নামিয়ে দেবে। কারণ, ছাগলনাইয়া বাজারের একটু আগেই বাঁশপাড়া জমিদার বাড়ি ও সাত মঠ যাওয়ার রাস্তা।

Feature Image – মাদিহা মৌ

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
Booking.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *