গোমুখ অভিযান: গোমুখের পথে ট্রেক শুরু

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry

এই সেই স্বপ্নের সকাল, সুখের ভোর আর আবেগের মুহূর্ত। একটু পরেই গাঙ্গোত্রী থেকে স্বপ্নের সেই গোমুখ, পদ্মার উৎস মুখে যাবার মূল ট্রেক শুরু করবো। আমরা যেখানে, মানে যে হোটেলে ছিলাম সেখান থেকে গোমুখ ট্রেক শুরু করার দুটো পথ আছে। সবচেয়ে প্রচলিত যে পথ, সেটা হলো গতরাতে মন্দিরের আরতি সন্ধ্যা দেখে আসার পথেই যেতে হবে। মন্দির পর্যন্ত গিয়ে সিঁড়ি দিয়ে পাহাড়ের উপরে উঠে ট্রেক শুরু করতে হবে।

আর দ্বিতীয় পথ হলো, আমাদের হোটেলের সাথেই, যেখান থেকে গতকাল গোমুখ যাবার অনুমোদন নিয়েছিলাম সেই অফিসের সাথে লাগোয়া পাহাড়ি সরু পথে ট্রেক করে পাইন বনের মধ্যে দিয়ে, ঘোড়ার আস্তাবল পেরিয়ে, ঘন অরণ্য ভেদ করে মূল ট্রেকের চেক পয়েন্ট। যেখানে আগের দিনের অনুমোদন পত্র দেখিয়ে, নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে, স্লিপ নিয়ে মূল ট্রেক শুরু করতে হবে।

ট্রেক শুরুর পথে। ছবিঃ লেখক

অন্য দুই সহযাত্রীকে বুঝিয়ে আমরা পাইন বন, ঘন অরণ্য, ঘোড়ার আস্তাবল আর গা ছমছমে পাহাড়ি, নীরব, নির্জন আর শিশির ভেজা পিচ্ছিল পথটাকেই বেছে নিলাম। কারণ আমার মনে হয়েছে রোমাঞ্চের নেশাতেই যেহেতু এতদূর এসেছি তবে শুরুতেই কেন সেই রোমাঞ্চকর পথে যাব না? কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব না করে পাহাড়ি ট্রেইল দিয়ে আমাদের পথ চলা শুরু করলাম। স্বপ্নের আর সাধনার সেই গোমুখের গন্তব্যে।

পথের শুরুতেই একদম খাড়া ঝুরো মাটির পথ বেয়ে উঠতে হলো পাহাড়ি ট্রেইলে। যে পথে কোথাও কোথাও পাহাড়ি ছোট ঝর্ণাধারা বয়ে গিয়ে বিপজ্জনকভাবে পিচ্ছিল হয়েছিল। খুব সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছিল, কাঁধের বেশ ভারী ব্যাগের জন্য। ও হ্যাঁ, একটা কথা তো বলা হয়নি। দীর্ঘ পাহাড়ি ট্রেইলে, ব্যাগের ওজন কমাতে আমরা আমাদের ব্যবহৃত কাপড়, যেগুলো আপাতত আর পরা হবে না আর যেগুলো আগামী দুই দিনের জন্য প্রয়োজন নেই সেগুলো ওই হোটেলেই অন্য একটা ব্যাগে ভরে রেখে গিয়েছিলাম দুইদিন পরে ফিরে এসে আবার এই হোটেলেই থাকবো সেই শর্তে। যে কারণে ব্যাগ কিছুটা হলেও হালকা করতে পেরেছিলাম।

প্রায় ১০ মিনিটের খাড়া ট্রেইল শেষ করেই ঘন পাইনের অরণ্যে গিয়ে উঠলাম। সারি সারি পাইনের কালো, বাদামী দীর্ঘ শরীরের গাছগুলো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের গায়ে গায়ে। রাতভর ঝরে পড়া শিশির কণাগুলো জমে ছিল পাইনের পাতায় পাতায়, ডালে ডালে আর শরীরে গড়িয়ে পড়ে ভিজে কালো রঙ ধারণ করেছিল পাইনের বাদামী শরীরগুলো। একটা নিস্তব্ধ অরণ্যে তখন আমরা তিনজন। কিছুটা সময় দাঁড়ালাম শুরুর পাইনের বনে। চারদিকটায় একটু চোখের পলক ফেলে ভালো করে দেখে নিলাম।

অবাক অরণ্যে। ছবিঃ লেখক

রাতের শিশির আর পাহাড়ি ঝর্ণার পানি বয়ে যাচ্ছে রাস্তা কোথাও কোথাও। ভিজে, ভয়ানক পিচ্ছিল হয়ে আছে সেই পথ। নিচে কয়েকশ ফুট গভীরে গাঙ্গোত্রীর লোকালয়। পাহাড়ের শরীরে এখানে ওখানে কয়েকটি ছোট কুড়েঘর, ঘাস, লতাপাতা আর নাম না জানা গুল্ম লতায় আচ্ছন্ন সেগুলো। আরও নিচে তার নিজস্ব কিন্তু অবিরত সুর বিলিয়ে বয়ে চলেছে গঙ্গা, পদ্মা বা স্থানীয় ভাগীরথী নদীর জলধারা। তারও ওপারে সবুজ পাহাড়ের নীল আকাশ ছুঁতে চাওয়া!

এসব কয়েক মিনিট দেখে আবারো পথ চলার শুরু। গা ছমছমে একটা অনুভূতি ছিল সেই অরণ্যে, পাইনের বনে। এর আগে পাইন বন দেখেছি, ঘুরেছি একটু আধটু কাশ্মীরে, ঘোড়ায় রাইড করেছি। কিন্তু এমন ঘন কালো আর বিশাল বিশাল পাইনের অরণ্যে এমন নির্জন পাহাড়ি পথে তো এর আগে এমন দীর্ঘ হাঁটা বা ট্রেক করা হয়নি। তাই সেই সময়ের, ট্রেক শুরুর প্রথম পরিবেশ, প্রকৃতি, পাহাড়, অরণ্য, গাছ, ঘাস, লতাপাতার ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাওয়া একটা অদ্ভুত অনুভূতিতে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। সেই অনুভূতি আর ট্রেইল শুরুর প্রকৃতির স্মৃতি ধরে রাখতেই প্রথমবারের মতো ক্যামেরা বের করে কয়েকটি ক্লিক করে রাখা।

অরণ্যর ফাঁক গলে গঙ্গা। ছবিঃ লেখক

এই নির্জন পথে প্রায় ২০ মিনিট হাঁটার পরেই দূরে কোথাও চিহিহি শব্দ শুনতে পেলাম। কিছুদূর এগোতেই পাহাড়ের এক ঢালে বিশাল একটা ঘোড়ার আস্তাবল চোখে পড়লো। এখান থেকে ঘোড়াগুলোকে সকালে গাঙ্গোত্রী মুখে নিয়ে যাওয়া হয়। যারা পায়ে হেঁটে গোমুখ যেতে পারে না বা পারবে না তারা চাইলে নির্ধারিত অর্থের বিনিময়ে ঘোড়ায় চড়ে যেতে পারে। অনেক অসুস্থ বা বৃদ্ধ বা নারী বা শিশুরা এই ঘোড়ার বাহন ব্যবহার করতে পারে। অনেকেই ঘোড়ায় চড়ে যায় বা যাচ্ছে দেখলাম।

ঘোড়ার আস্তাবল পেরিয়ে, বিশাল গাছের গুড়ি মাড়িয়ে, পাহাড়ি সরু ট্রেইলের কোথাও কোথাও ইট সিমেন্টের নিরাপত্তা বাঁধা তৈরি করা হয়েছে গাঙ্গোত্রী থেকে গোমুখ যাবার মূল ট্রেক পয়েন্ট থেকে। অনেক লম্বা, বাঁকানো সিঁড়ি পাহাড়ের ট্রেইল থেকে এঁকেবেঁকে নিচে নেমে গেছে নদীর তীর পর্যন্ত দেখতে পেলাম। ততক্ষণে ভোরের আঁধার কেটে সূর্যের আলো দেখা দিয়েছে। ধুসর আকাশ সূর্যের আলোর পরশ পেয়ে নীল রঙের আপন সাজে সেজে উঠেছে। পাহাড়ের পাইনের অরণ্যে আলো-আধারির একটা সম্মোহনী খেলা শুরু হয়েছে, সূর্যের আলো আর ছায়ায় দ্বন্দ্বে। নিচে বয়ে চলা গঙ্গার জলে সূর্যের প্রথম আলো পড়ে রূপালী ঝিলিক দিয়ে যাচ্ছিল চোখে মুখে।

ঘোড়ার আস্তাবল। ছবিঃ লেখক

ততক্ষণে গোমুখ ট্রেকের প্রথম চেক পয়েন্টে চলে এসেছি। সামনেই পাহাড়ি ছোট্ট একটু সমতলে বেশ বড় গেট ঝলমল করে হেসে উঠেছে আগত অগণিত ট্রেকারদের দেখে। আজকে আমরা আর আমাদের পেছনে সিঁড়ি বেয়ে একটা বড় টিম উঠে এসেছে গোমুখ ট্রেকের জন্য। চেকপোস্টের গেট পেরিয়ে আগের দিনের অনুমোদন পত্র, পাসপোর্টের কপি নিয়ে সবাইকেই একে একে আর্মি নিয়ন্ত্রিত অফিসে গিয়ে দেখা করতে হলো যার যার টিম নিয়ে।

মুগ্ধ সকালের শুরু। ছবিঃ লেখক

ভারতীদের জন্য ১৫০ আর বিদেশীদের জন্য ৬০০ রুপীর নির্ধারিত ফি দিয়ে গাঙ্গোত্রী ন্যাশনাল পার্কের মধ্যে দিয়ে ট্রেক করে চিরবাসা হয়ে ভুজবাসা বেজক্যাম্পে যাবার অনুমোদন মিলল। যা শেষ হবে গোমুখ গিয়ে। আর যদি কেউ তপোবন যেতে চায় তাদের জন্য চার্জ আলাদা। সবকিছুর নির্ধারিত তালিকা আর অর্থের পরিমাণ বোর্ডে দেয়াই আছে। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে শুরু হলো গোমুখের দিকে, চিরবাসার উদ্দেশ্যে আসল ট্রেক।

The post গোমুখ অভিযান: গোমুখের পথে ট্রেক শুরু appeared first on Trip Zone.

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
Booking.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *