গোমুখ অভিযান: গাঙ্গোত্রীর পথে পথে, বাঁকে বাঁকে রোমাঞ্চ

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry

উত্তরকাশী থেকে চলতে শুরু করতেই গঙ্গা বা পদ্মা আমাদের পথের সাথে গা ঘেঁষে ঘেঁষে চলতে থাকলো। অথবা বলা যেতে পারে বা ঠিক হবে যে গঙ্গার স্রোতধারার পথ ধরে সে যে পথ পেরিয়ে এদিকে লোকালয়ে এসেছে আমরা সেই পথে, তাকে অনুসরণ করে, তার গায়ের সাথে গা লাগিয়ে পথ বানিয়ে সেই পথেই তার উৎস মুখ দেখতে চলেছি। সবার সাথে সবার হালকা আলাপ পরিচয় শেষ হবার পরে আমি সামনের সিটে বসে অখণ্ড মনোযোগে জীপের জানালা দিয়ে দুচোখ ভরে চারপাশ আর সামনের অপার প্রকৃতি দেখতে লাগলাম।

সবচেয়ে বড় ব্যাপার যেটা, সেটা হলো এটি একদম নতুন একটি প্রদেশ আমার জন্য। একদম নতুন একটি গন্তব্য আর তার চেয়েও বড় যে ব্যাপার সেটা হলো আমি যে পথে চলেছি, যে নদীর সাথে গা ঘেঁষে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি, যে নদী এই পথ পেরিয়ে, আরও কয়েক হাজার মাইল পথে সামনে গিয়ে আমাদের বাংলাদেশের উপর দিয়ে অতিবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পতিত হয়েছে আর যে নদীর তীরবর্তী শহরে আমার জন্ম হয়েছে সেই নদীর উৎসমুখ দেখতে যাচ্ছি! এটা ভেবেই কেমন যেন একটা সুখ সুখ অনুভূতি আর কেমন যেন একটা রোমাঞ্চের শিহরণ বয়ে গেল সেটা বোঝানো মুশকিল। এটা শুধু অনুভব করা যায়, ব্যাখ্যা করা কঠিন নয়, অনেকটাই অসম্ভব।

গঙ্গার পাড় ঘেঁষে ছুটে চলা। ছবিঃ লেখক

এখানে, এই পুরো ১০০ কিলোমিটার পথে যেতে, পথ কখনো একদম নদীর সাথে মিশে যায় যায়। যেখানে নদী অনেকটাই বিস্তৃত, অগভীর, পাথরে পাথরে বিস্তীর্ণ চারদিক, যেখানে নদী যেন একটা সমতল ভূমি দিয়ে সামনের দিকে বয়ে গেছে ধীর লয়ে।

কখনো এই একই নদী সমতল থেকে চলে গেছে দুই পাহাড়ের গভীরে, গিরি খাতে। যেখানে নদী যেন শান্ত কোনো নদী নয়। নদী যেন ভীষণ ভয়ঙ্কর, প্রলয়ংকারী, প্রমত্তা আর সবকিছু ভেঙেচুরে ছুটে চলে পাহাড়ের পর পাহাড় ডিঙিয়ে।

এই পাহাড়ি পথে যেতে যেতে ক্লান্ত নদী, কখনো ঝর্ণাধারার সাথে সুখের মিলনে ব্যস্ত, কখনো নিজেকে সঁপে দিয়েছে বিশাল বিশাল ঝরে পড়া ঝর্ণাধারার কাছে। কখনো ছোট ছোট ঝর্ণাধারা নিজেকে সঁপে দিয়েছে নদীর উত্তাল বুকে, গভীর জলরাশিতে। মিলেমিশে হয়ে গেছে একাকার। ঝর্ণা-নদী-ঝর্ণা মিলনে নদী রূপ নিয়েছে আপন ছন্দে হেঁটে চলা চঞ্চলা নারীতে।

যে পথ শেষ না হলেই খুশি হতাম হয়তো! ছবিঃ লেখক

এখানে, এই পথে নদী কখনো শুকিয়ে গেছে পাথরের, মাটির আর পাহাড়ের হাহাকারে। যেখানে জলের স্পর্শ দিয়ে নদীকে আবারো জাগিয়ে তুলেছে বর্ষায় যৌবন ফিরে পাওয়া কিশোরী ঝর্ণাধারা। একটি, দুটি, তিনটি এমন করে একে একে শত শত কিশোরী ঝর্ণাধারা নদীকে দিয়েছে নতুন যৌবন, নতুন প্রাণ আর নতুন করে তার স্বরূপে বয়ে চলার সকল সম্ভার। তাই তো ঝর্ণা আর নদীতে এত আপন, এত কাছাকাছি আর এত এত সম্মীলন। যেখানে ঝর্ণা আছে, সেখানে নদীও আছে। আর যেখানে নদী আছে সেখানে কোথাও না কোথাও ঝর্ণাও আছে। আছে প্রাণ, আছে প্রাচুর্য, আছে ভালোলাগা আর ভালোবাসা। নদীতে, ঝর্ণায়, পাহাড়ে পাহাড়ে, মানুষে, প্রাণীতে আর বেঁচে থাকার সকল অবলম্বনে।

নদী, ঝর্ণা, পাহাড় আর প্রকৃতির কোনো বিকল্প যেন নেই আমাদের জীবনে। জীপের দোলায় দুলে দুলে, পাহাড়ি বাঁকে বাঁকে, হেলে দুলে, ঢেউ খেলে খেলে যেতে যেতে নদী, পাহাড়, ঝর্ণা, পাথর, প্রকৃতি দেখে দেখে আমার এমনই অনুভূতি হলো। আহ, পৃথিবীটা আসলেই কী যে ভীষণ সুন্দর, কত কিছু যে আছে দেখার, বোঝার, অনুভব আর উপলব্ধি করার, যেটা কেবল নীরব, নির্জন সবুজ আর শান্ত প্রকৃতির মাঝে এলেই অনুভব করা যায়। আর সেটা যদি হয় এমন পাহাড়, ঝর্ণা, নদী, পাথর, মেঘ, বৃষ্টি, ফুলে, ফলে সুশোভিত কোনো জায়গা তবে তো সেই অনুভব যেন জীবনের মর্মার্থ বুঝিয়ে দেয় প্রতি ক্ষণে ক্ষণে।

পাহাড় থেকে নেমে আসা অসংখ্য ঝর্ণাধারা। ছবিঃ লেখক

এসব দেখতে দেখতে আর নিজের সাথে নিজেই কথা বলতে বলতে জীপ বেশ অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে ঘড়ি দেখে বুঝলাম, জীপ একটি পাহাড়ের পিঠে দাঁড়িয়ে যাওয়াতে। এখানে ২০ মিনিটের বিরতি খাবার-দাবার বা ফ্রেশ হওয়ার আর চা-বিস্কিট খাওয়ার। প্রায় দেড় ঘণ্টার পথ পেরিয়ে এসেছি এতক্ষণে বুঝতেই পারিনি প্রকৃতির সম্মোহনে। ক্ষুধা একদম নেই। গাড়ি থেকে নেমে রাস্তার ওপাশে হোটেলের দিকে তাকাতেই দেখলাম বিশাল বিশাল সবুজ পাহাড় আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। যে ডাক উপেক্ষা করার সাধ্য আমার নেই। কোনোদিন ছিল না আর কোনোদিন হবে বলেও মনে হয় না। তাই ঝটপট রাস্তা পেরিয়ে হোটেলের ছাদে উঠে পড়লাম পাশের সিঁড়ি দিয়ে।

এ কী দেখছি? এতক্ষণ যা ভাবছিলাম, যেসব রঙিন কল্পনা মনকে রাঙিয়ে দিচ্ছিল তার সবকিছুই যেন একসাথে ধরা দিয়েছে এখানে। যে হোটেলের ছাদে উঠেছি সেই হোটেলের সাথেই, নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে উত্তাল গঙ্গার পাগল করা স্রোত। পাথরে পাথরে বাঁধা পেয়ে পানির আঁকাবাঁকা পথ তৈরি করেছে নদীর নতুন নতুন গতিপথ। নদীর ওপারেই সবুজ পাহাড় যেন আকাশ ছুঁয়েছে একে একে। আকাশের এক পাশ দিয়ে সবুজ পাহাড়ের শরীর বেয়ে নেমে এসেছে রুপালী ঝর্ণাধারা, মিশে গিয়েছে বয়ে চলা গঙ্গার স্রোতে, নিজেকে উজাড় করে দিতে ঝাঁপ দিয়েছে গঙ্গায়, পেতে সবটুকু সুখের শীতল অবগাহন।

যেন স্বর্গীয় কোন ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম! ছবিঃ লেখক

পাহাড় থেকে নেমে আসা অসংখ্য ঝর্ণাধারা। ছবিঃ লেখক

সবুজ পাহাড়ের গায়ে গায়ে, ঝর্ণা ধারার চারপাশে ফুটে আছে নাম না জানা কত শত ফুল আর তার বর্ণীল রঙ রাঙিয়ে তুলেছে চারপাশ। দুই পাহাড়ের গায়ে লেপটে আছে ছোট্ট একটি নাম না জানা গ্রাম। ঠিক গ্রাম নাকি স্বর্গের নীল আকাশ থেকে নেমে বা বিধাতা তার নিজ হাতে এখানে বসিয়ে দিয়ে গেছে বুঝে ওঠা মুশকিল। সম্মোহনী মুগ্ধতায় চুম্বকের মতো আঁটকে রেখেছিল আমায় সেখানে সেই হোটেলের ছাদে। কখন যেন ২০ মিনিট পেরিয়ে ৩০ মিনিট হয়ে গেছে বুঝতেই পারিনি। জাপানী যাত্রীর ডাকে চেতনা ফিরে পেলাম।

নিচে নামতে হবে, গাড়িতে উঠতে হবে, গাঙ্গোত্রি যেতে হবে, বাকিটা পথ পেরোতে হবে। কিন্তু স্বর্গীয় এই প্রকৃতি ছেড়ে সেই মুহূর্তে কিছুতেই যেতে ইচ্ছে করছিল না। এমন ছবির মতো সাজানো স্বর্গীয় সবকিছু এর আগে এমন করে, এত কাছে পাইনি, নিজের চোখে দেখিনি। পাহাড়ের ঢালে বসে বয়ে যাওয়া উত্তাল নদীর স্রোত দেখা, নদীর ওপারে সবুজ পাহাড়ের আকাশ ছুঁয়ে থাকা, আকাশ থেকে পাহাড়ের শরীর বেয়ে নেমে আসা রূপালী ঝর্ণাধারা, দুই পাহাড়ের মাঝে ফুলে ফুলে সেজে থাকা ছোট্ট একটি স্বর্গীয় গ্রাম! এসব ছেড়ে কি গাড়ির মতো যন্ত্রে উঠে যেতে মন চায়?

গঙ্গার তীর ধরে আবারো ছুটে চলা। ছবিঃ লেখক

কিন্তু উঠতে হয়, ফিরতে হয়, আক্ষেপ বুকে রেখেই গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যেতে হয়। তাই করেছিলাম পরের পথটুকু কিছুটা ঘুমে, কিছুটা জাগরণে, ফেলে আসা স্বর্গীয় গায়ের ছবি চোখে ধরে রেখে শেষ বিকেলে পৌঁছে গিয়েছিলাম আমার সেদিনের মূল গন্তব্য গাঙ্গোত্রীতে। 

The post গোমুখ অভিযান: গাঙ্গোত্রীর পথে পথে, বাঁকে বাঁকে রোমাঞ্চ appeared first on Trip Zone.

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
Booking.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *