এক অভিজাত কলকাতার গল্প

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry

বহুবার কলকাতায় গিয়েছি এখন পর্যন্ত। ঘুরেছি কলকাতার নানা জায়গায়, অলিতে- গলিতে। থেমেছি, হেঁটেছি, বসেছি রাস্তার মোড়ে, পার্কে, ময়দানে, নদীর পাড়ে। ভালো লেগেছ মোটামুটি সব কিছুই, শুধু হোটেল ম্যানেজার, মালিক দাদাদের কতিপয়ের ব্যবহার ছাড়া। কলকাতা আমার কাছে একটা মায়ার শহর। এই শহরের কোথায় যেন একটা টান আছে, আছে একটা অন্য রকম আকর্ষণ, আছে ভিন্ন একটা মাদকতা। যে কারণে এত এতবার কলকাতায় গিয়েও এই শহরটার অদ্ভুত আকর্ষণ আর ভিন্ন ভালো লাগাটা আমার কাছে আজও ফিকে হয়নি এতটুকু।

কিন্তু যতই কলকাতায় যাই না কেন, আর যতই এদিক সেদিক আর ওদিকে ঘুরি না কেন, আমি নিম্নবিত্ত বলেই বোধহয়, কলকাতার বনেদী বা অভিজাত পাড়ায় কখনো পা রাখা হয়নি। রাখবো কী করে? সে সাধ, সাধ্য আর সময় কোনো কিছুতেই কেন যেন কোনো বারই আমি কুলিয়ে উঠতে পারি না। প্রতিবার কলকাতা হয়ে নানা জায়গায় যাওয়া আর আসার সময় এত এত তাড়া থাকে যে কী বলবো। এই নানা রকম তাড়া থাকার কারণে কখনো নিম্নবিত্তর এই চোখ জোড়া মধ্য বা উচ্চবিত্তর অভিজাত কোনো কিছু চোখে পড়েনি বা সেই সুযোগ পাইনি।

আভিজাত্যের প্রবেশদ্বার। ছবিঃ লেখক

কিন্তু এবার, দিল্লী থেকে কলকাতায় ফিরে, ঢাকায় ফেরার আগের সন্ধ্যায়, আমার ক্ষীণ ভাগ্য হয়েছে সনাতনী কলকাতা থেকে একটু দূরের এক অভিজাত কলকাতার অল্প কিছু দেখার। সেও অবশ্য যতটা না আমার নিজের আগ্রহে তার চেয়ে বেশী আরেক অভিজাত প্রয়োজনে। অবশ্যই এই অভিজাত প্রয়োজনটা আমার নিজের নয়। এক অভিজাত আত্মীয়র, আরও এক অভিজাত প্রয়োজনে।  

তো সেদিন রবিবার আর কলকাতার ভালো মল বা দোকানগুলো সাপ্তাহিক বন্ধ থাকে। কী করি? কী করি? কলকাতার বন্ধু পরামর্শ দিল, ভাইজান একটু দূরেই, অটোতে করে কুইসট মল চলে যান। মাত্র ১০/১৫ রুপী নেবে। ভালো জায়গা, ভালো লাগবে আর আপনার জিনিসটা পেয়ে যাবেন।

বেশ, তবে তাই হোক। ছেলে আর ছেলের মাকে নিউমার্কেটের কাজে লাগিয়ে দিয়ে আমি কুইসট মলের জন্য অটোতে চেপে বসলাম। ততক্ষণে মায়াবী কলকাতা মিঠে শীতের বিকেল শেষ হয়ে সন্ধ্যার আলো-আধারির আহ্বান শুরু হয়ে গেছে। আর সেই সাথে হালকা শীতের আমেজ থেকে বেশ একটা কনকনে শীতের বাতাস গায়ে এসে লাগতে লাগলো, অটোর খোলা দুইপাশ থেকে। গায়ে, মাথায় গরম কাপড় আড়াল করে চুপ করে অটোতে বসে রইলাম ১৫ মিনিটের মতো। ১৪ রুপী ভাড়া নিয়ে অটো থেকে নামিয়ে দিল পার্ক সার্কাসের মোড়ে।

অভিজাত বিপণী বিতান কুইসট মল। ছবিঃ লেখক

সামনে একটু এগিয়ে গিয়ে, সিগন্যাল পার হলেই কলকাতার সবচেয়ে বড় শপিংমল কুইসট মলের দেখা পাওয়া যাবে। বাইরে থেকে দেখে যতটা আলো ঝলমলে, জাঁকজমকপূর্ণ আর জৌলুসে ভরপুর মনে হয়, ভেতরে ঢুকে সেই ধারণা একেবারেই পাল্টে যাবে মুহূর্তেই। কারণ বাইরের আঙিনা, নানা রকমের রঙ, ঢং আর সাজসজ্জা ভেতরের অভিজাত্য আর জমকালো আয়োজনের তুলনায় কিছুই না। ঢুকতেই চোখ ছানাবড়া করে দেয়ার মতো বিশাল এক ক্রিসমাস ট্রি চোখে পড়লো। কারণ কদিন আগেই খ্রিস্ট ধর্মের প্রধান উৎসব শেষ হলো, সেই রেশ তখনো রয়েছে পুরো মলের অভ্যর্থনা জুড়ে।

প্রবেশ পথের শুরুতেই নীল আলোর রোশনাই ছড়িয়ে পড়েছে পুরো মলের সবটুকু জুড়ে, বিশাল এক ফোয়ারার চারপাশ থেকে। এখানে কেন যেন সবাই ভিড় করে আছে কিছুই বুঝলাম না। তবে দুই একটি ছবি তোলার লোভ সামলাতে পারলাম না কিছুতেই। উহু, সেলফি নয়, ওটাতে আমি অভ্যস্ত বা আনন্দিত নই। ছবি তুলেছি সেই ফোয়ারার, নীল-বেগুনী আলো আর কুইসট মলের শুরুর অনিন্দ্য লুকের।

বড় দিনের জমকালো আয়োজন। ছবিঃ লেখক

ভিড় ঠেলে সামনের দিকে পা বাড়ালাম। কিন্তু কোন দিকে যাবো? ডানে না বামে, দ্বিধান্বিত। চারদিকে আর চারপাশে এত এত কিছুর আকর্ষণ যে যে কাজে এখানে এসেছিলাম সেটা বেমালুম ভুলে গেলাম। ব্র্যান্ডের দোকান দেখবো, নাকি প্রিয় কোনো দোকানে একটু ঢুঁ মারবো নাকি নানা রঙের, বর্ণের, ঢঙের আর পোশাকের মানবী দেখবো নিজেই বুঝতে পারছিলাম না। দারুণ একটা সংকটে পড়ে গিয়েছিলাম কিছুক্ষণ।

অবশেষে কোনো এক মাদক ঘ্রাণের টানে একটি সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলাম, সম্মোহনের মতো। সিঁড়ি বেয়ে উপরের তলায় নেমে অবাক আর বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইলাম নানা রকম ব্র্যান্ডের শোরুমগুলোর দিকে। কোন পণ্যের কোন শোরুম দরকার? সব রকম পণ্যের, সব রকম শোরুম তার সবটুকু জৌলুস ছড়িয়ে দিয়েছে মলের দ্বিতীয় তলার চারপাশ জুড়ে। আর শুধু যে দোকান আর কেনাকাটা তা নয়, জাস্ট ঘুরে দেখা, আয়েশ করা, একটি ভিন্ন আমেজে কিছু সময় কাটানোর জন্যও অপূর্ব একটি জায়গা এই কুইসট মল।

জিভে জল নিয়ে আসা চকলেট সম্ভার। ছবিঃ লেখক

পরের ফ্লোরে কসমেটিক্স, ঘড়ি, চকলেটসহ নানা রকম প্রসাধনীর বর্ণীল আয়োজন চোখ ধাঁধিয়ে দেবে যে কারো। আমার মতো কার্টুন থেকে কাপড় চোপড় কেনা ক্ষ্যাত পর্যন্ত বিমোহিত হয়ে গিয়েছিলাম। এই দোকানে, ওই দোকানে, সেই দোকানে ঢুঁ মারি আর এটা, সেটা, ওটা দেখে, নেড়েচেড়ে হাপিত্যেশ করি। এক চকলেটের শোরুমে ঢুকে তো আমার মাথা খারাপ হবার জোগাড় হয়েছিল চকলেটের মৌ মৌ মাদকতাময় গন্ধে। খুব খুব আর খুব ইচ্ছা করছিল একবক্স চকলেট কিনে ফেলি চকলেটের মতো নরম, কোমল আর মোহময়ি ললনার কাছ থেকে! কিন্তু অর্থের কাছ বাঁধা পড়ে দেখে দেখেই স্বাদ মেটাতে হলো। কয়েকটি ছবি তুলে বেরিয়ে এলাম বিরস বদনে।

এই তলা তো তবুও ছিল একটা পর্যায়ের। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে ফিরে আসতে পেরেছি। কিন্তু পরের ফ্লোরে গিয়ে আমি প্রায় শেষ। চনমনে কফির মাদকতাময় গন্ধ যেন চুম্বকের মত টেনে নিয়ে যাচ্ছিল এক একটা কফি শপের দিকে। কোথাও সদ্য ওভেন থেকে নামানো ধোঁয়া ওঠা চকলেট কেক, তো কোথাও বার্গারের অদ্ভুত গন্ধে মাথা খারাপ হবার জোগাড় আর কোথাও মিষ্টি প্রিয় মানুষকে নিঃশেষ করে দেয়ার জন্য টসটসে রসে ভরা আর ভেজানো ডুমো ডুমো রসগোল্লার হাসি দেখে নিজেকে ধরে রাখা দায়।

অভিজাত আয়োজন। ছবিঃ লেখক

আর এসবের সাথে লাল, নীল, বেগুনী, হলুদ, গোলাপি, সবুজ আলোর রোশনাই, রঙ বেরঙের মানুষের নানা রঙের পোশাক আর সেই সাথে শত শত মোবাইলের হাজার হাজার ক্লিক আরও ঝলমলে আর আকর্ষণীয় এক আবহ তৈরি করে রেখেছিল পুরো মলের সবটুকু জুড়ে। যেদিকে তাকানো যায়, সব জায়গাতেই যেন মুগ্ধতা আর মুগ্ধতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এখানে যারা আসে বা এসেছে সবাই যে কেনাকাটা করতে এসেছে তা নয়। খুব খেয়াল করে দেখলাম যে এখানে অনেকেই এসেছে শুধু ঘুরতে, সময় কাটাতে, ছবি তুলতে আর রঙ রূপের, ঝলমলে, চকচকে কুইসট মল ঘুরে ঘুরে দেখতে। ঠিক আমাদের বসুন্ধরা সিটির মতো করে।

তবে আধুনিকতায়, নান্দনিকতায়, স্থাপত্যকলায়, জাঁকজমকে, আলোকায়নে, সাজসজ্জায়, মাধুর্যে, আকর্ষণে আর আভিজাত্যে উপমহাদেশের আবহ থেকে অনেক দূরে তার অবস্থান বলে আমার মনে হয়েছে। যাক, যেভাবেই হোক শেষ পর্যন্ত সনাতনী আর প্রাচীন কলকাতার অলিগলি আর নানা রকম কীর্তি দেখার পরে দেখা পেয়েছি এক আধুনিক আর আভিজাত্যে ভরপুর, অভিজাত কলকাতারও।

আলোর রোশনাই। ছবিঃ লেখক

তাই ঠিক করেছি, ছেলেকে আর তার মাকে নিয়ে এরপর গেলে ওকে এই অভিজাত কলকাতার স্বাদ কেমন সেটাও পরখ করাবো।

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
Booking.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *