একদিনে সীতাকুণ্ডের ৩ স্থান ভ্রমণের ইতিবৃত্ত

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry

রাত তখন প্রায় শেষের পথে। গন্তব্যে পৌঁছাতে আর অল্প সময় বাকি। রাতের অন্ধকার ফুঁড়ে আবছা আলো আর সাথে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টির যে মুগ্ধতা তার স্বাদ আগে পাইনি কখনো। দু’নয়ন ভোরে দেখে নিচ্ছি পাহাড়ের সাথে আকাশ যে মিতালি পেতেছে সেই অপরূপ রূপ। সাথে বৃষ্টির অপার্থিব সৌন্দর্য। আমাদের ভ্রমণ কাহিনীর শুরুটা হয়েছিল এভাবেই।

একদিনের ভ্রমণে
সীতাকুণ্ডের তিন প্রাকৃতিক স্থানের সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ মিলেছিল কিছুদিন
আগেই। শহরবাসীর কাছে একটু প্রাকৃতিক ছোঁয়া নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। আমিও এই দলেরই
বাসিন্দা। তাই সুযোগটা লুফে নিতে দেরি করলাম না একটুও।

আমাদের দলে ছিলাম আমরা ৪৩ জন। কমলাপুর স্টেশন থেকে রাত সাড়ে ১০টার মেইল ট্রেনে করে সীতাকুণ্ড যাবার সিদ্ধান্ত হলো। এছাড়া চট্টগ্রামগামী অন্য যেকোনো ট্রেনের টিকেট মিলবে ৩২০-১,১০০ টাকার মধ্যে। এছাড়া ঢাকা থেকে সীতাকুণ্ড রুটে চলাচল রয়েছে সোহাগ, হানিফ সহ আরো কিছু বাসের।

ভোরে ট্রেন পৌঁছে গেল সীতাকুণ্ড স্টেশনে। আমরা স্থানীয় বাজারে হোটেল থেকে সকালের নাস্তা সেরে নিলাম। প্ল্যান অনুযায়ী সকালে পাহাড়ে ওঠার কথা। কিন্তু এ কী! হঠাৎ করেই তুমুল বৃষ্টি শুরু। মন খারাপ করে ঘণ্টা খানেক অলস বসে থাকার পর বৃষ্টি কমলো। কিন্ত সারাদিনের পরিকল্পনাতে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হলো। বৃষ্টিস্নাত পিচ্ছিল পাহাড়ে ওঠা বেশ বিপজ্জনক। তাই সিদ্ধান্ত হলো আগে বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত, তারপর গুলিয়াখালী সমুদ্রসৈকত এবং সব শেষে ওঠা হবে চন্দ্রনাথের চূড়ায়।

সাগরকূলে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা ঝাউবন; image source: travelling in bangladesh.

বৃষ্টি কমে আসলে সীতাকুণ্ড বাজার থেকে আমরা আমাদের রিজার্ভ করা সিএনজিতে করে যাত্রা করি বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকতের দিকে। প্রায় ৪০ মিনিটের মাথায় আমরা পৌঁছে যাই কাঙ্ক্ষিত স্থানে। আমার দেখা প্রথম সমুদ্র সৈকত এই বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত। তাই বিস্ময়ের ঘোর যেন কাটতেই চাইছিলো না।

আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে লোহার ব্রিজটি। ভাটার সময় সামান্য ঢেউয়ে পায়ের পাতায় আছড়ে পড়ে পানি। কী যে অপূর্ব সে অনুভূতি। পূর্ণ জোয়ারে ব্রিজটির বেশিরভাগ অংশই তলিয়ে যায় সমুদ্রের নিচে। সমুদ্রপাড়ের মানুষের আরেক আয়োজন ছিল স্পীডবোট আর ইঞ্জিনচালিত নৌকা। চাইলে এগুলোর সাহায্যে সমুদ্রের অনেকটা দূর পর্যন্ত ঘুরে আসতে পারেন।

বাঁশবাড়িয়া সমুদ্রসৈকত; image source: সৈয়দ আরিফ

আমরা যে সময়টাতে সমুদ্রে ছিলাম তখন ছিল সম্পূর্ণ জোয়ার। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের মতো বিশালাকার ঢেউ না থাকলেও সেই বেগ একেবারে কম ছিল না। ঘণ্টা খানেক সমুদ্রে দাপাদাপি শেষে সমুদ্র পাড়ে বসেই কেটে গেলো আরো কিছু সময়।

বলে রাখা ভালো, চাইলে ভেজা জামাকাপড় বদলে নিতে পারবেন। তবে এই সেবা পেতে ৫ বা ১০ টাকা গুনতে হবে জনপ্রতি। তবে এই সমুদ্রে বেশিদূরে যাওয়া উচিত হবে না। তীর থেকে এর ভূমি সমতলভাবে না গিয়ে জায়গায় জায়গায় বেশি গভীর হয়ে গেছে। যা খুবই বিপজ্জনক হতে পারে।

গুলিয়াখালী সমুদ্রে নেমে গেছে জোয়ার; image source; youtube

এবারে আমরা বেলা ১টার দিকে রিজার্ভ করা সেই সিএনজিতে চড়ে রওনা হলাম গুলিয়াখালি সমুদ্রসৈকতের দিকে। কিন্ত সীতাকুণ্ড বাজার থেকে আসতে হলে আপনাকে ৫ কি.মি. দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে।

তবে এই আফসোস আমার বহুকাল থেকে যাবে। গুলিয়াখালীর পথে রাস্তার দু’ধারের চোখ জুড়ানো দৃশ্য ফেলে কেমন করে যে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে গেলাম। সহপাঠীর এক ধাক্কায় চোখ কচলাতে কচলাতে যখন সিএনজি থেকে নামলাম, আমার অবস্থা তখন এমন যে আর কয়েক সেকেন্ড হা করে থাকলে মশা মাছি ঠিকই কোনো গর্ত ভেবে আমার মুখে ঢুকে যেতো।

জোয়ারে এই সমুদ্রের আকর্ষণ বেড়ে যায় বহুগুণে; image source: youtube

আমরা তখন একটা বাঁধের উপর দাঁড়িয়ে। আমার একপাশে নীলাভ মোহাচ্ছন্ন পাহাড় আর আরেক পাশে সবুজ গালিচা পাতা সমুদ্র। স্বচক্ষে না দেখলে বিশ্বাস করার কোনো উপায় নেই যে বাংলার প্রকৃতির আনাচে কানাচে লুকিয়ে আছে এত সুধা, এত ঐশ্বর্য। দলবেঁধে এক দৌড়ে পৌঁছে গেলাম ঘাসের গালিচায়।

সমুদ্রের পানি এখন বেশ খানিকটা দূরে। কিন্তু ঘাসের মাঝের গর্তগুলোয় জমে থাকা থকথকে কাদা আর কেওড়া গাছের ভেজা শ্বাসমূল জানান দিচ্ছিলো কিছুক্ষণ আগেই জোয়ার হয়ে গেছে। ঘাসের উপর শুয়ে আকাশটা দেখছিলাম। নীল স্বচ্ছ আকাশে ভাসছে তুষার শুভ্র মেঘ। মৃদু বাতাসে সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দিচ্ছিলো এক নিমেষেই।

এদিকে দুপুরের খাবার না খাওয়ায় পেটে ছুঁচো ছুটছিল। স্থানীয়ভাবে মুরাদপুর বীচ নামে পরিচিত এই স্থানের আশেপাশে এখনো তেমন লোকালয় গড়ে ওঠেনি। তাই অগত্যা এক টং দোকান থেকেই সামান্য কিছু খেয়ে নিতে হলো।

খুব সামান্য সময়ের জন্য গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকতে অবস্থান করার পর এবার ছোটার পালা চন্দ্রনাথ পাহাড়ে। গুলিয়াখালি থেকে চন্দ্রনাথ যেতে আমাদের সময় লেগেছিল ৩০ মিনিটের মতো। তবে সীতাকুণ্ড বাজার থেকে চাইলে পায়ে হেঁটে বা সিএনজি করে যেতে পারেন মন্দিরে। ভাড়া নেবে ২০ টাকা। ১,১৫২ ফুট উঁচু এ পাহাড়ে প্রায় ঘণ্টা তিনেকের ট্রেকিং ছিল জীবনের প্রথম পাহাড় ট্রেকিং। যারা পাহাড় ট্রেকিং এ প্রথম তাঁরা সাথে খাবার পানি, স্যালাইন নিয়ে উঠবেন। সাথে ভারি কোনো ব্যাগ না রাখাই ভালো।

পাখির চোখে চন্দ্রনাথের চূড়ার দৃশ্য; image source: deskgram.net

এদিকে সিএনজি থেকে নেমে বিস্ময়ে তাকিয়ে আছি পাহাড়ের দিকে। আমার বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে সামনে তাকিয়ে দেখি সবাই অনেকটা এগিয়ে গেছে। কিছুটা ওঠার পরই বয়োজ্যেষ্ঠ একজনকে দেখা গেলো বাঁশের তৈরি লাঠি বিক্রি করছে। প্রতি পিস ১০ টাকা মূল্যে। প্রায় সবাই একটা করে নিয়ে নিলাম। লাঠি ট্রেকিং করতে দারুণভাবে সাহায্য করে।

image source: trip zone

কিছুদূর অতিক্রান্ত হবার পরে দুটো রাস্তা চোখে পড়লো। বামদিকের পথটি তৈরি মাটি আর পাথরের সংমিশ্রণে। আর ডানদিকেরটি সিঁড়ি সম্বলিত। উপরে ওঠার ক্ষেত্রে পথ সিঁড়ি ভাঙার চেয়ে পথ সমতল হলে কষ্ট কম হয়। তাই বামদিকের রাস্তাটিকেই বেছে নিলাম। পথে চোখে পড়লো ছোটখাটো দুই-তিনটি ঝর্ণা। চাইলে অমিয় ধারায় নিজেকে শীতল করে নিতে পারবেন। হাতে সময় কম ছিল তাই চলতি পথের মায়াবী সৌন্দর্যকে প্রাণভরে দেখতে না পারার আফসোসকে সান্ত্বনা দিলাম এই বলে যে পরের বার অনেক সময় হাতে নিয়ে আসব।

চন্দ্রনাথ মন্দিরের আগেই দেখা পেয়ে গেলাম আরেকটি মন্দিরের। নাম বিরুপক্ষ মন্দির। মন্দিরের পুরনো দেয়ালের সোদা গন্ধ আর দিগন্ত জোড়া সবুজে মোহাচ্ছন্ন হয়ে থাকতে ইচ্ছা করছিলো সারাজীবনের জন্য। কিন্ত হাতে সময় নেই একদম। সন্ধ্যার আগেই চূড়ায় উঠে আবার ফেরত আসতে হবে।

পাহাড়ের উপর থেকে চারপাশের দৃশ্য; image source: sadman amin

চটজলদি বাকি পথটুকু শেষ করে এবার চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছে গেছি। আমি এখন পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচু জায়গাটাতে, চন্দ্রনাথের মন্দিরে। খুশিতে বাচ্চাদের মতো লাফিয়ে উঠতে ইচ্ছা হলো। মুহূর্তে ভুলে গেলাম এতটা পথ পাড়ি দেবার ক্লান্তি। কিন্তু আনন্দে ভাঁটা দিতে সময় হাজির হয়ে গেলো। আধ ঘণ্টার মধ্যেই নিচে নেমে আসতে প্রস্তুত হলাম সবাই। নামার সময় বেছে নিলাম ডানদিকের সিঁড়িকে। খুব অল্প সময়ের মাঝেই নেমে এলাম নিচে।

চন্দ্রনাথ মন্দির; image source: youtube

সন্ধ্যায় সীতাকুণ্ড বাজারে রাতের খাবার সেরে নিলাম। ১০০-২০০ টাকার মাঝেই বেশ ভালো খাবার পেয়ে যাবেন স্থায়ীয় বাজারে। রাতে রওনা হলাম ঢাকাগামী বাসে। এভাবেই একদিনের ভ্রমণ শেষে সুস্থভাবে ঢাকা ফিরলাম। সবার কাছে অনুরোধ থাকবে যেখানেই ভ্রমণে যান না কেন সে জায়গার পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে সজাগ থাকবেন।

আপনাদের ভ্রমণও হোক আনন্দপূর্ণ।

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
Booking.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *